মে / ০৭ / ২০২১ ০৯:৫৮ পূর্বাহ্ন


আসিয়ানে মিয়ানমার, যিনি অভিযুক্ত তিনিই অতিথি

ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত আসিয়ান বৈঠকে এবারের প্রধান আলোচ্যসূচি ছিল মিয়ানমারের পরিস্থিতি। মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের বিষয়টি প্রধান আলোচনায় থাকার কথা ছিল। আবার এই বৈঠকে অতিথি মিয়ানমারের সামরিক প্রধান, যিনি গত পহেলা ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে একটি নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। গত কয়েক মাসে এই অবৈধ ক্ষমতা গ্রহণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে সাতশরও বেশি সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আসিয়ানের এবারের বৈঠকে আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল সেটাই। আবার সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যিনি এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছেন। তার নাম জেনারেল মিন অং লাং। যার নেতৃত্বে নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখলের প্রধান অভিযোগ।

যেহেতু সম্মেলনটি আসিয়ানের এবং যেহেতু সেই বৈঠকে আমন্ত্রিত আসিয়ানভুক্ত আরেকটি দেশ মিয়ানমার, যেখানে গণতন্ত্রের আন্দোলন চলছে এবং সামরিক বাহিনী এই আন্দোলন দমানোর জন্য নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে এবং তার ক্ষমতা দখলকারী সেনাপ্রধান যখন সেখানে উপস্থিত থাকছেন, তখন এই বৈঠকের দিকে নজর ছিল বিশ্ব রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের। অনেকের প্রত্যাশা ছিল মিয়ানমারের সেনাপ্রধানকে তারই অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের জন্য কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। কার্যত সে রকম কিছুই হলো না। নেপথ্যে মিয়ানমারের শক্তিশালী শুভানুধ্যায়ী কেউ অনুঘটকের ভ‚মিকা পালন করেছে কিনা, তা এখন বিশ্লেষণের বিষয়। মিয়ানমারের ক্ষেত্রে এরকম উল্লেখ করার মতো বহু উদাহরণ রয়েছে।

এর আগে গত কয়েক দশক থেকেই মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালানোর। জাতিসংঘ এই হত্যাযজ্ঞকে এথনিক ক্লিনজিং বা একটি জাতিগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার প্রচেষ্টা বলে অভিহিত করেছে এবং এই হত্যাকাণ্ড বর্তমান সময়ের অন্যতম নিষ্ঠুরতা হিসেবে উল্লেখ করেছে। একটি জাতিগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার জন্য সুপরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড চালানো হচ্ছে বলে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছিল। হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হওয়ার পরও পার পেয়ে গেছে মিয়ানমার। রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর এই হামলায় বরাবরই নিন্দায় মুখর ছিল মুসলিম বিশ্বও। অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে মুসলিম নিধনের বিষয়টি উত্থাপনই করা হলো না। অন্যদিকে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে এসে মুসলিম বিশ্বের যেসব নেতাকে কান্নাকাটি করতেও দেখা গেছে, তারাও এই বৈঠকে নিশ্চুপ। এসব দেখে অনেকের প্রশ্ন, বিশ্ব রাজনীতি কি একটি হিপোক্রেসির মধ্যে পড়ে গেছে? কপট চেহারার রাজনীতির খপ্পরে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবন বা গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা কি এভাবেই কাতরাতে থাকবে?

পৃথিবীটা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশ্ব পরিমণ্ডল কেন উষ্ণ হচ্ছে- এর জন্য কাঁদবার লোক আছে। বনাঞ্চল কমে গেলে বৃক্ষপ্রেমীরা অঝোরে কাঁদছেন। সুন্দরবনের বাঘ কেন কমে যাচ্ছে, এর জন্যও কাঁদবার লোকের অভাব নেই। জলে-জঙ্গলে বিভিন্ন প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে- এর জন্য বিশ্বের এক শ্রেণির মানুষের উদ্বেগের অভাব নেই। কিন্তু পৃথিবীতে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করলে কাঁদবার লোকের বড়ই অভাব। ষাটের দশকে ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাওয়ার জন্য পৃথিবীতে বহু লোক খুঁজে পাওয়া যেত। লাতিন আমেরিকার বহু দেশে সংগ্রামরত মানুষের পাশে অনিবার্য শক্তি ছিল চে গুয়েভারার নেতৃত্বাধীন আদর্শে উজ্জীবিত এক জনগোষ্ঠী। আদর্শবান জনগোষ্ঠীর সে পুরো কাঠামোটিই এখন একেবারে অনুপস্থিত। এখন প্রকৃত কান্নার জায়গা দখল করে নিয়েছে মেকি কান্না। মানুষ কান্না করার আগে নিজের হিসাবটা এখন ভালোভাবে কষে নেয়। রাজনীতিটাও একবার ভেবে দেখে। জিও পলিটিক্যাল বা করপোরেট হিসাব যদি নিজের সঙ্গে না মেলে বা বিষয়টিকে যদি নিজের রাজনীতির সঙ্গে মেলাতে না পারে, তাহলে হৃদয় থেকে কোনো রাষ্ট্র কেন, কোনো ব্যক্তির কান্নাও বের হয় না।

পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো পৃথিবীর কোন দেশের গণতন্ত্রের অবস্থা কি, নির্বাচনের হালহকিকত কি, ব্যক্তি বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা অথবা গণতন্ত্রের চর্চা করা যাচ্ছে কিনা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে অনেক উদ্বিগ্ন। আবার নিজেদের ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বার্থ যদি এসব দেশের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে এ সমস্ত স্বাধীনতার বিষয়টি গৌণ হয়ে যায়। যেমন মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে এসব গণতন্ত্রের চর্চার ব্যাপারে পশ্চিমা দেশগুলো নিশ্চুপ থাকে। কারণ সেখানে তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ আছে। ফলে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থই সমস্ত পশ্চিমা গণতন্ত্রচর্চার মাপকাঠির প্রধান নিয়ামক শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আসিয়ানের ক্ষেত্রেও এই ধরনের পশ্চিমা চিন্তা ভর করেছে বলে মনে হয়। আসিয়ানের অনেক দেশ মিয়ানমারের ভূরাজনৈতিক অবস্থানের সুবিধাভোগী হতে চায়। অনেকেই মনে করে, সেখানকার খনিজ সম্পদ ব্যবহার করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। মিয়ানমারে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ আসিয়ানভুক্ত আরেকটি দেশ সিঙ্গাপুরের। ফলে মিয়ানমারে গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে কি হচ্ছে না, অং সান সু কি ক্ষমতায় থাকল কি থাকল না, নাকি সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় থাকল, তার চেয়েও বড় বিবেচনার বিষয় হচ্ছে- তাদের নিজস্ব বিনিয়োগের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি কোন পক্ষ বেশি দেখবে সেই বিবেচনাটি। একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়ে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের বিষয়টি তখন গৌণ হয়ে যায়, যখন এসব চিন্তার চাইতে নিজস্ব বিনিয়োগের চিন্তাটি গুরুত্ব পায় বেশি। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। লোক দেখানো আলোচনা হয়েছে। পাঁচ দফা প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, যা কোনো দিনই মিয়ানমারের জনগোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা বা তাদের ভাগ্য পরিবর্তনে কোনো ভ‚মিকা রাখবে না।
তার আগে একটু দেখি নিই গত ২৪ এপ্রিল আসিয়ানের এই বৈঠকে গৃহীত পাঁচ দফায় কি বলা হয়েছে?
পাঁচ দফায় আছে :
১. মিয়ানমারে বিবদমান পক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে সহিংসতা পরিত্যাগ করবে এবং সব ক্ষেত্রে চ‚ড়ান্ত সংযম পালন করবে।
২. জনগণের স্বার্থে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে গঠনমূলক আলোচনা শুরু করতে হবে।
৩. আসিয়ানের মহাসচিবের সহায়তায় এই জোটের চেয়ারম্যানের বিশেষ দূত সংলাপে মধ্যস্থতা করবেন।
৪. আসিয়ান মিয়ানমারে মানবিক সহায়তা প্রদান করবে।
৫. আসিয়ানের বিশেষ দূত ও প্রতিনিধি দল বিবদমান পক্ষগুলোর সঙ্গে কথা বলার জন্য মিয়ানমার সফর করবেন।
এই হচ্ছে ৫ দফা, যেখানে অং সান সু কির মুক্তি বা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টির কোনো উল্লেখ নেই। সামরিক বাহিনীর সেই অবৈধ ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের বিভিন্ন শহরে প্রতিদিন রাস্তায় বিক্ষোভ করতে গিয়ে শত শত সাধারণ মানুষ যে মারা যাচ্ছে, সেই প্রসঙ্গেরও উল্লেখ নেই। ফলে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, মিয়ানমারের বিদ্যমান সংকট বা গণতন্ত্রের আকাক্সক্ষায় মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে যে সংগ্রাম মিয়ানমারের সাধারণ নাগরিক চালাচ্ছে, ১০ দেশের এই জোট আসিয়ান শেষ পর্যন্ত সেখানে কোনো ভ‚মিকায় রাখল না। এই দেশগুলোর নিজেদের স্বার্থের কাছে বলি হয়ে গেল মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা। একই সঙ্গে লাখো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার ভবিষ্যৎও।
মিয়ানমারকে নিয়ে আসিয়ান দেশগুলোর এই দ্বিচারিতা নতুন কিছু নয়। যখনই মিয়ানমারে সামরিক শাসন আঘাত হেনেছে, সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ নিতে শুধু আসিয়ান নয়, গণতন্ত্রের সবক দেয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিমা দেশও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এসব কারণেই সে দেশের সামরিক বাহিনী বারবার দেশটিতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে উৎখাত করতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে না। হয়তো এটাকে গণতন্ত্রকামী মিয়ানমারের সাধারণ নাগরিকদের নিয়তিই বলতে হবে।