নভেম্বর / ২৯ / ২০২১ ০৯:০৭ অপরাহ্ন

মালালার বিয়ে

এই ‘আমি’ ক্ষুদ্র ব্যক্তি, সবাই বলেঃ বড় শিক্ষক। দেশে-বিদেশে শিক্ষকতায় গেল ১লা নভেম্বর ৪৬ বছরে ঢুকলাম (আলহামদুলিল্লাহ)। বাংলাদেশের সিলেটের স্বনামধৈন্য শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগেই একটানা ২৭ বছরের বেশি। আমার পিএইচডি গবেষণার থিসিসের মূল বিষয় ছিল “নারীবাদ”, বা যাকে সবাই বলে “নারী-অধিকার”। দীর্ঘ ৭ টি বছর ধরে গবেষণা করতে হয়েছিল ফিকশনের নারী-চরিত্র বা নায়িকা-চরিত্রগুলোর উপর, বিশেষ করে খেয়াল রাখতে হয়েছিল ‘উইমেন-সাইকোলোজি’ বা নারীর মন-মানসিকতা ও মনস্তাত্বিক বিষয়াদির উপর। লাইনে লাইনে অধ্যয়ন করতে হয়েছিল বৃটিশ ফিকশন, ফ্রেঞ্চ ফিকশন, আমেরিকান ফিকশন, জার্মান ফিকশন, রাশ্যান ফিকশন, আফ্রিকান ফিকশন, ডায়াস্পরা ফিকশন, ইত্যাদি, অরও কত কি। 

তারপরও নিস্তার নাই। অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে গিয়ে অমুক অমুক বই-জার্নাল এক সপ্তাহ পড়ে এসে রিটোর্ট করো, অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ের অমুক অমুক অধ্যাপকের কাছে যাও, গাইডলাইন নিয়ে এসে রিপোর্ট দাও। বিজ্ঞ-নিষ্ঠুর সুপারভাইজারের এবারের নির্দেশঃ কোন একটা বিদেশে যেতে হবে, অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি দেখে আস, আর অমুক অমুক প্রফেসরের সাজেস্চনস্ ও গাইড-লাইন নিয়ে এসো (অর্থাৎ, ডাটা-কালেক্সন)। কাকুতি-মিনতি করে বললাম, “ম্যাডাম, ৭ বছর তো বিদেশে শিক্ষকতা করেছি, বিদেশি অনেক ফিকশনের রেফারেন্স আমি দিতে পারব; তাই, যদি দয়া করে একটু রেহাই দেন “। আল্লাহ্র শুকরিয়া, উনি রাজি হয়ে গেলেন এক শর্তেঃ “সঠিক জায়গায় সঠিক রেফারেন্স পুট করতে পারবেন তো”? কত দিন যে ভেবেছিঃ আমার কপালে বোধ হয় পিএইচডি নেই, অবশেষে এই একটিমাত্র ডিগ্রি ভাগ্যে জুটল ৭ বছর পর। 

উপরের কথাগুলো বলতে হয়েছে এ লেখার শিরেনামের প্রয়োজনে। নোবেল-বিজয়ী মালালা। গোটা বিশ্ব জানে তার ইতিকথা। ওগুলোতে আমি হাতই দেব না। শিক্ষামূলক কাজে গ্রামের বাড়িতে ছিলাম এক সপ্তাহ। শহরে ফিরে অন-লাইন পত্রিকায় ঢুকেই দেখিঃ মালালা-র বিয়ে হয়েছে। উৎসাহের কমতি তো নেই, ঘাটাতে ঘাটাতে তাবৎ কিছুই জানলাম, আর আমার জানার মধ্যে ঘাটতি তো থাকবেই। কারণ, আমি আমার স্বদেশে, আর কোথায় সাতসমুদ্র তের নদীর ওপারে মালালা, জীবনে যে মেয়েটি বা তার পরিবারের সাথে আমার কোন দেখা-সাক্ষাৎ নেই, শুধুই মিডিয়া-মাধ্যম ছাড়া। ঊষ্ণ অভিনন্দন জানাই মালালাকে, ধৈন্যবাদ জানাই তার পরিবারকে, যাঁরা তার স্বীয় স্বাধীনতা, ব্যক্তিত্ব, পছন্দ-সিদ্ধান্তকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে তার আগানোর পথে তাকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করেছেন, যা একটি আলোকিত পরিবারের বৈশিষ্ট। সাধুবাদ ও মোবারকবাদ জানাই তার শুভাকাঙ্খিদেরকে, আর সব শেষে দোয়া ও আশির্বাদ জানাই তার বর-কে, তথা, এ দম্পতিকে। ধারে-কাছে থাকলে মালালা হয়তবা আমার কোন এক নাতিনের মতই হত। 

নোবেল বিজয়ী এ অক্সফোর্ড গ্রাজুয়েট ইতিমধ্যেই তার নিজের লিখা ৪-৫ টি বই বিশ্ববাসিকে উপহার দিতে পেরেছে। তার কষ্ট গেছে, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষনে সে লড়েছে, পেয়েছে বিশ্ববাসির সহমর্মিতা ও মানবতা। সে গুলি খেয়েছে - এটা তার কোন সফলতা নয়, তার প্রথম সফলতা হলো - সে নারী-শিক্ষা বা নারী-অধিকার-আন্দোলনের অগ্রদূত হিসেবে আভিভর্‚ত হয়েছে এমন একটি অন্ধকার জায়গা থেকে, যেখানে নারি-অধিকার বা নারি-শিক্ষার কোন বালাই তো নেই-ই, বরং যেখানে শিকড় পেতে আছে কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা; যেখানে নারিকে মূল্যায়ন করা হয় মানুষ বা ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং শুধুই নারি বা পণ্য হিসেবে। আমার স্বীয় গবেষণা আমাকে শিখিয়েছেঃ মালালা যে ২৪ বছর বয়সে বিয়ে করেছে এবং বিয়ে করতে পেরেছে=এটা তার আর্ একটি সফলতা। তার পরবর্তী সফলতা হলো=সে বিয়ে করেছে তার নিজের পছন্দের নায়ককে, স্বীয় সিদ্ধান্তে। এ ক্ষেত্রে সে ৫০০% সফল। এ ক্ষেত্রে তার মিশনের বাস্তব প্রতিফলনও ঘটেছে। সে বিয়ে করেছে পারিবারিকভাবে। এটাও তার একটি সার্থকতা। পিতৃতান্ত্রিকতা থেকে সে বেরিয়ে আসতে পেরেছে - এটাও তার সাফল্যের একটা বিরাট পরিচয়। আবার নিজস্ব কৃষ্টি-কাল্চার-শিকড়, সব কিছুকে সে ধরে রেখেছে, এটাও তার বিরাট অর্জন। 

মালালা ২৪ বছর বয়সে বিয়ে করেছে - এটাও তার একটি সফলতা, এবং তার বয়সটাই প্রমান করে এ বিয়ের সার্থকতা। নারি-মনস্তত্তের দিক থেকে, অর্থাৎ আমার গবেষণা অনুযায়ী, একজন নারীর চুড়ান্ত জৈবিক চাহিদা থাকে ২০ এর পর থেকে ৩৫ বছর বয়স পর্যন্ত। নানা মুনির নানা মত থাকতেই পারে, তবে মালালার বয়স এবং বিয়ে দু’টোই সময়োপযোগি। কারণ, আমাদের লেখক-সাহিত্যিকগন তো আলঙ্কারিকভাবে বলে উঠবেনঃ ষোড়শি-অষ্টাদশি যুবতী। হয়ত এ কারণেই কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এত বড় জমিদার হয়েও তাঁর ছোট মেয়ে মীরা দেবীকে ১৩ বছর বয়সেই বিয়ে দিয়েছিলেন। তখনকার সমাজ এবং সময় হয়ত এরকমই ছিল। কিন্তু, ফ্যামিনিজমের এক্টিভিষ্টরা বা নারীবাদি নাররিা কখনো পুরুষ-বিদ্বেষী হন না। যথাসময়ে ছোট-বড় পারিবারিক আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে বিয়ে করতে পারা - এখানেও মালালা সফল। 

আর, সকল নারিবাদি নারিরাও অপরাপর নারিদের মতই সময়মত আশা করেন স্ত্রীত্ব এবং মাতৃত্ব। বিয়ের মাধ্যমে এ দু’টোতে তাদের নারি-চাহিদার সিংহভাগই পেয়ে যান বলে তারা আশ্বস্থও থাকেন। নারিবাদের ভাষায়ঃ ঋবসরহরংঃ ড়িসবহ ধৎব হবাবৎ সবহ-যধঃবৎং. ঞযবু ধষধিুং বিষপড়সব নড়ঃয রিভবযড়ড়ফ ধহফ সড়ঃযবৎযড়ড়ফ; নঁঃ ধং ৎবমধৎফং সড়ঃযবৎযড়ড়ফ, ঃযবু ধৎব সড়ৎব ড়ৎ ষবংং ৎবংবৎাবফ, ঃযবু ধৎব ভড়ৎ ঞডঙং ধহফ ঞঐজঊঊং, ধহফ হড়ঃ রহ ঞঊঘং ধহফ ঞডঊখঠঊং, অর্থাৎ, নারিবাদি নারিরা আদপেই পুরুষ-বিদ্বেষী নন। তরা স্ত্রীত্ব এবং মাতৃত্ব উভয়টাই আলিঙ্গন করেন; তবে মাতৃত্বের বেলায় তাঁরা খানিকটা সীমবদ্ধতার পক্ষে, তাঁরা চান দুই বা তিন সন্তান, কখনো তাঁরা দশ-বার সন্তানের পক্ষে নন। এ কথাগুলোর পক্ষে আমরা সকল পুরুষরাও অবশ্যই একমত থাকব। 

আর, বস্তুবাদি নারিবাদিগণ (সধঃবৎরধষরংঃ ভবসরহরংঃং) আরো এক ধাপ এগিয়ে। তাঁরা দাবি করেন, পেটে সন্তান ধারণ, বহন, দুগ্ধপান করানো, লালন-পালন ইত্যাদি সবই ঢ়ধরফ লড়নং, অর্থাৎ, পারিতোষিকযোগ্য কাজ। মহা বিজ্ঞান-গ্রন্থ আল-ক্বোরআনও পরিষ্কারভাবে এ ইংগিৎ দিয়েছে। কারণ, এ কাজগুলোতে পুরুষ অবলীলায় অক্ষম। তবে ‘মা’ হয়ে স্ত্রী তো আর প্রতিটি সন্তানের বেলায় এবং মাসে মাসে স্বামীর কাছে বেতন চাইতে পারেন না। আর এ জন্যই ইসলাম নারি বা মায়ের সম্মনার্থে একেবারে গোড়ায় কেটে দিয়ে বলে দিয়েছেঃ আল-ক্বোর-আনের ভাষায়ঃ তোমরা (পুরুষরা) তোমাদের স্ত্রীদের ফরজ দেন-মোহর সন্তুষ্টচিত্তে (অগ্রিম) দিয়ে দাও। এখন স্ত্রী এক সন্তান নেক আর ১০ সন্তান নেক - এটা তার এবং তার স্বামীর সার্বিক সক্ষমতার ব্যাপার। 

আমার গবেষণার এক পর্যায়ে উঠে এসেছে মানব-ইতিহাসের সর্ব-প্রথম নারিবাদি সাহসী লেখিকা হচ্ছেন বৃটিনের ম্যারি ঊলস্টোনক্রাফ্ট  ১৭৫৯ - ১৭৯৭ । নারি-অধিকারেরে উপর তাঁর হই-চই তুলা প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৭৯২ সালে। আমার এ গষেণায় ২৭ জন নারিবাদি লেখিকার নাম উঠে এসেছে। এখানে এ উপমহাদেশের শুধু একজনের নাম রয়েছে, তিনি আর কেউ নন, তিনি মালালা ইউসুফজাই। ২৭ জনের মধ্যে তিনি আছেন ২৫ নম্বরে। ২৪ বছর বয়সের একজন মেয়ের পক্ষে সিরিয়্যালে ২৫ নম্বর স্থান দখল করা চাট্টিখানি কথা নয়। আর এ ২৭ জনের মধ্যে বেশিরভাগই আমেরিকান, বৃটিশ এবং ফ্রেঞ্চ। এ গবেষণায় দেখা যায়, ঊলস্টোনক্রাফ্টের পূর্বে কোন মানব-লেখক নারি-অধিকার নিয়ে কিছুই লিখেন নি। তবে এ গবেষণা যে ভুল, অল্পদিন পরেই তা আবার আমার গবেষণাতেই ধরা পড়েছে। 

আমি আমার গবেষণায় ঊলস্টোনক্রাফ্টের অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে পেছন দিকে অর্থাৎ অতীতের দিকে যেতে থাকলাম। পেয়ে গেলাম ষোড়শ শতাব্দীর ইংরেজ লেখিকা ‘জেইন এঙ্গারকে। নারি-অধিকারের উপর তাঁর লিখা প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছিল ১৫৮৯ খৃষ্টাব্দে। ১৬০৪ সালে পেলাম ফ্রেঞ্চ লেখিকা ‘ম্যারি দ্য গৌর্নে’-কে এবং ১৬৪১ সালে আবিষ্কার করলাম ডাচ্ কবি এ্যনা ভ্যান স্কোরম্যান-কে। ১৬৭৩ এ আসলেন ফরাসি ক্যথলিক ধর্মযাজক পৌলেন ডি লা ব্যারে এবং একই বছরে আবার আসলেন England বাথসুয়া ম্যাকিন। ১৬৯৪-তে পেলাম ইংরেজ দার্শনিক ম্যারি এ্যস্টেল-কে। অর্থাৎ, ঊলস্টোনক্রাফ্ট-ই নারি-অধিকারের উপর প্রথম লেখক নন।