অক্টোবর / ১৭ / ২০২১ ০৩:৩৩ পূর্বাহ্ন

সাংবাদিকতা পেশার মর্যাদা রক্ষায় কয়েকটি প্রস্তাবনা

সিলেটে স্মরণকালের ভয়ংকরতম অবক্ষয়ের শিকার আমাদের প্রিয় পেশা সাংবাদিকতা। অপেশাদার, গন্ড-মূর্খের দল মহিয়ান-গরিয়ান এ পেশাটিকে আজ খাদের কিনারে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। স্যোসাল মিডিয়ার প্রভাবকে যথেচ্ছ ব্যবহার করে মতলববাজ গোষ্ঠী হাল আমলে সাংবাদিকতার এক অদ্ভুত সংস্করণ আবিষ্কার করেছে-  যেখানে নীতি-নৈতিকতার বালাই নেই, শিক্ষা-প্রশিক্ষণের চর্চা নেই। নূন্যতম যোগ্যতার পূর্বশর্ত এখানে উপেক্ষিত,  প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো চরম অবজ্ঞার শিকার। স্যোসাল মিডিয়ার ফ্রি ডোমেইনের সুবাদে এবং নাগরিক সাংবাদিকতা তত্ত্বের উদগ্র অপব্যবহারের মাধ্যমে সাংবাদিকতার মৌল কাঠামোকে এরা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তাদের অপেশাদার কর্মকান্ডে দিনে দিনে এ পেশাটি হাসির খোরাকে পরিণত হচ্ছে। আর আমরা পেশাদার সাংবাদিকরা হাহুতাশ করছি। কত দ্রুত পেশাটি ধ্বংসের তলানীতে গিয়ে ঠেকছে, তা অবাক বিস্ময়ে চেয়ে চেয়ে দেখছি। যেন কারো কিছুই করার নেই। ভাবখানা এমন যে, আমরাতো ওদের সাংবাদিক হিসেবে স্বীকার করি না। অথচ, আমাদের স্বীকার,  অস্বীকারে এদের কিছুই যায়-আসে না।  সাংবাদিকতার তকমা ব্যবহার করেই তারা তাদের অপকর্ম চালাচ্ছে।  ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক সাধারণ মানুষ তাদেরকে সাংবাদিকই ভাবছে। এতে দিনশেষে তাদের সব অপকর্মের দায় গিয়ে পড়ছে সাংবাদিকতা পেশার ওপর। সাংবাদিকতা পেশা নিয়ে এই অপেশাদার গোষ্ঠীর এমন আস্ফালনে শুধু মুল ধারার সাংবাদিকরাই উৎকন্ঠিত নন, সাধারণ মানুষও বেশ ত্যক্ত, বিরক্ত। 'প্লিজ এদের থামান, প্রতিরোধ করুন' সচেতন জনগোষ্ঠীর এমন আর্তনাদ প্রায়ই দেখা যায় ফেসবুকের পাতায়। কিন্তু, কে থামাবে এদের? বিড়ালের গলায় ঘন্টাটি কে বাঁধবে? 

আমি মনে করি দ্বায়িত্বটি সাংবাদিক সমাজেরই নিতে হবে । নানা কারণে আমাদের মধ্যে বিভেদ আছে, এটা সত্য। কিন্তু এরচেয়েও কঠিন সত্য পেশাটির অস্তিত্ব আজ সংকটাপন্ন। এমন অবস্থায় সাংবাদিকতা পেশার মান-মর্যাদা রক্ষায় আমাদের একমত্য প্রয়োজন। কি করা যায়, কি করা উচিত তা নিয়ে অন্ততঃ ভাবনা শুরু করা দরকার।

টানা ২২ বছর ধরে এ পেশায় মনোযোগী ছাত্র হয়ে কাজ করছি বলে এক্ষেত্রে আমারও কিছু দায় আছে মনে করি। সেজন্য সংকট মোকাবেলায় আমার কিছু ভাবনা তুলে ধরছি।


প্রথমত- নাগরিক সাংবাদিকতাকে বর্তমান সময়ে পুরোপুরি অস্বীকারের সুযোগ নেই। কিন্তু এটিকে পেশাদার সাংবাদিকতার এখতিয়ার, কর্মপরিধি এবং কর্মপদ্ধতির সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। নাগরিক সাংবাদিকতা মুল ধারার সাংবাদিকতার জন্য 'সংবাদের সূত্র' বা, 'সোর্স' হিসেবে গণ্য হতে পারে। এই এখতিয়ার পর্যন্তই নাগরিক সাংবাদিকদের সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। পূর্ণাঙ্গ সংবাদ সংগ্রহ, অনুসন্ধান, সম্পাদনা এবং উপস্থাপনের স্বীকৃত ব্যবস্থাপণা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেই। ফলে ওদিকে তাদের না যাওয়াই ভালো। 


দ্বিতীয়ত- সাংবাদিকতা পেশার স্বীকৃত কর্মপদ্ধতি নিয়ে অনলাইন ব্লগারদের টানটানি না করাই ভালো। ব্লগার বা, সিটিজেন জার্নালিস্টরা বিষয়ভিত্তিক টেক্সট কিংবা অডিও-ভিডিও কন্টেন্ট তৈরি করে তা স্যোসাল ব্লগে প্রচার করতেই পারেন। কিন্তু সাংবাদিকদের আদলে বুম হাতে কাউকে ইন্টারভিউ করার এখতিয়ার তাদের নেই। এ ব্যাপারে একটি পরিস্কার সীমারেখা টানার সময় এসেছে। কোন ফেসবুকার বা ইউটিউবার টেলিভিশন বুম ব্যবহার করবেন না। অডিও রেকর্ডের প্রয়োজনে তারা লেপেল মাইক্রোফোন ব্যবহার করতে পারেন, লগো খচিত বুম নয়। লাইসেন্সপ্রাপ্ত টেলিভিশনসমুহের লগো খচিত বুম ছাড়া কোন বুম কেউ এলাও করবেন না। শৃঙ্খলা ফেরাতে সাংবাদিক সমাজকে এ ব্যাপারে কিছুটা নিষ্টুর হতে হবে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি।

তৃতীয়ত- ফেসবুক, ইউটিউবে লাইভ সম্প্রচারের অপব্যবহার ঠেকাতে হবে। রাষ্ট্রীয় আইন এবং প্রথা মেনে সরাসরি সম্প্রচারে বাঁধা নেই। কিন্তু ওয়ানম্যান ব্যবস্থাপনায় আইন, প্রথা এবং নৈতিকতা (এথিকস) বজায় রাখা কঠিন। সাম্প্রতিক ফেসবুক এবং ইউটিউব লাইভারদের মধ্যে আইন, প্রথা এবং এথিকস লঙ্ঘনের হিড়িক লক্ষ্মণীয়। এতে সমাজে বিশৃঙ্খলা প্রকট আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। এক্ষেত্রে আমার প্রস্তাব কোন কারেন্ট ইভেন্ট স্যোসাল মিডিয়ায় লাইভ সম্প্রচারের প্রয়োজন বোধ করলে সেখানে শুধু ক্যামেরার কাজ লাইভ হতে পারে, বুমের নয়।

(অসমাপ্ত)