জুলাই / ২৫ / ২০২১ ০৭:৩৩ অপরাহ্ন

জুলকার নাইন

এপ্রিল / ২২ / ২০২১
১১:২৭ অপরাহ্ন

আপডেট : জুলাই / ২৫ / ২০২১
০৭:৩৩ অপরাহ্ন

তারপর কতো পাপ’



127

Shares

আজ দুপুরে দীঘির পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন আব্দুল গফুর মিয়া। এই পথে আসতে তার অত্যন্ত অনীহা। অবশ্য এই পথে গেলে তার বাড়ি নিকটে, তবুও এপথে তিনি খুব বেশি আসা-যাওয়া করেন না। এপথে এলেই গফুর সাহেবের অত্যন্ত আবেগ-অনুভূতি বেড়ে যায়। এই বয়সে এত আবেগ ভালো লাগে না।

ঝড় সঁপয ঢ়ধংংরড়হ ধঃ ঃযরং ধমব ফড় হড়ঃ ভববষ মড়ড়ফ.

এপথে এলেই গফুর সাহেব ইংরেজিতে এই কথাগুলো বলেন আর মৃদু পায় হাঁটেন। তিনি চান কেউ তাকে দেখলে যেন মনে করে আমি কাজে ব্যস্ত। কিন্তু আজ দেখা হলো এই বাড়ির মেজো সাহেবের ছোট ছেলে আজিজুলের সাথে, সে ভাঙা সিঁড়িতে বসা। গফুর সাহেব তাকে দেখে মৃদুস্বরে বললেন, আজিজুল তুমি কবে আসলা?

স্যার, গত পরশু। ভাঙা সিঁড়িতে বসে কী ভাবছ উপরে উঠে আসো? পড়ে গেলে ব্যথার সীমা নাই, যাকে ইংরেজিতে বলে ঞযবৎব রং হড় ষরসরঃ ঃড় ঢ়ধরহ. তোমার বাবার বানানো স্কুল থেকে অবসরপ্রাপ্ত হলে কি হয়েছে, বোধশক্তি এখনো অবসরপ্রাপ্ত হয় নাই, বুঝলা সবকিছু আল্লাহপাকের দয়া। তার কথা শুনতে শুনতে আজিজুল সিঁড়ি থেকে উপরে উঠে এসে বলল, স্যার, বাবা চলে যাবার পর থেকে পরিবারের সব শানশওকত চলে গেল। সুশিক্ষিত হয়েও বাবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি জুটল না, শহরে থাকি। যা কামাই করি আমার তিন কন্যাকে নিয়া বেশ আছি। আমার বড় কন্যা কোহিনুর মাশাআল্লাহ? দেখতে রাজকন্যার মতো। স্যার, আপনার মনে পড়ে পাঠশালায় আমাদের একটা গল্প লেখানো হতো এৎবধঃ ৎরপয সধহ? গল্পটা আমি তুখোড় লিখতাম, পঞ্চাশে পঞ্চাশ। আপনি আমার কাছে এসে বলতেন, তোমাকে আরো দশ দেয়া যায়। আজকাল ওই গল্পের মতো এৎবধঃ ৎরপয সধহ বাড়ি থেকে আমার কন্যার জন্য বিবাহের সম্বন্ধ আসে। কোহিনুরকে দেখে বলে, রাজি হয়ে যান আপনার কন্যাকে রাজরানী করে রাখা হবে। স্যার, ঘটনা তবে এখানে শেষ না বিরাট হিস্টরি।

যারা দেখে যান, পরের দিন লোক মুখে সমাচার পাঠায় আমার কন্যার নাকি মন্দচরিত্র আরো কত মন্দ কথা। শহরে থাকি, এমন রটনায় সবকিছু ছেড়ে বারবার চলে আসতে হয়। যা ছিল তা একে একে চলে গেল, এখন বংশপরিচয় খানিকটা আছে তা এখন নতুন সমাচার। গফুর সাহেব মৃদুভাবে মাথা নাড়াচ্ছেন আর বললেন, বিষয় অতি জটিল। আজিজুল বলল, স্যার, সময় তো কম হলো না এবেলা আমার বাড়িতে পায়ের ধূলি রাখবেন। গফুর সাহেব কোনো আপত্তি করল না। তারা দুজন বাড়ির ভেতরে চলে গেল। আজিজুল কোমল স্বরে ডাক দিল, কোহিনুর, কোহিনুর, কোই গ্যালা মা।

বাবার ডাক শুনে তিন কন্যা তড়িৎভাবে চলে এলো। তারা গফুর সাহেবকে সালাম দিয়ে কদমবুচি করতে লাগল। গফুর সাহেব খুব খুশি, হাসিমুখে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, বেঁচে থাকো তোমরা। পুরনো জমিদার কিসিমের বাড়ি দেখতে যেমন হওয়ার কথা, অমসৃণ ভাঙা পুরনো একটি ঘর। গৃহসজ্জা আসবাবপত্রাদি তেমন কিছুই নেই। কোহিনুর পুরনো একটি বিছানা বিছিয়ে দিল। তারা দুজন বসল।

কোহিনুরের মা আলেয়া খাতুন খাবার জল নিয়ে এলো। মৃদুস্বরে বলল, এই হাতে কত ভালো-মন্দ খাবার দিছি, এখন কি দিয়া ভাত দেব। গফুর সাহেব বললেন, দেও মা দেও এতে তোমার-আমার হাত নাই সব মহান আল্লাহপাকের মেহেরবান। তারা দুজন খেতে শুরু করল। গফুর সাহেব খাচ্ছেন আর কান্নাভেজা কণ্ঠে বললেন, আমি আশা ছেড়ে দিছি ভাগ্যে বোধহয় এ বাড়ির আহার আর খেয়ে যেতে পারব না। এই পরিণতিতেও আল্লাহপাক আশা পূরণ করেছেন। আর একটু সালুন দাও মা। কোহিনুর মার পাশে বসা। আজিজুল বলল, স্যার, আমার বড় কন্যার মাশাল্লাহ সংগীতের গলা বেশ চমৎকার, বাবা কোহিনুরের দিকে তাকিয়ে বলল, গাও মা গাও একটা গীত গাও। কোহিনুর মার দিকে তাকিয়ে গান গাইতে শুরু করল।

‘আঁধার রাতের শেষক্ষণে নামিল এমনি ক্ষণ,

নয়ন তারায় ভীতি না আসিল আর শয়ন।

গৃহের ধারে মন্দ বাতাসে বিদায় নিলো কতো কালের মধুর সপন,

আঁধার রাতের শেষক্ষণে নামিল এমনি ক্ষণ,

দেবতার মনে যদি হয় এতেই আনন্দ,

তবে বিদায় আমার শয়ন বিদায়।

গৃহের ধারে মন্দ বাতাসে’

গান শুনতে শুনতে আজিজুলের চোখ ভিজে উঠেছে, খাবার প্লেট সামনে থেকে সরিয়ে দিয়ে কান্নভেজা কণ্ঠে বলল, নেও কোহিনুরের মা নেও আর খাব না। গফুর সাহেব বললেন, বুঝলা একদিন তোমার কন্যা অনেক বড় হবে। সত্য রাজরানী হয়ে থাকবে, বড় ঘরে বিবাহ হবে বলো মাশাল্লাহ। এই বাড়ির বড় সাহেবের ছেলে আমির আলী গানের সুর শুনে অনেক আগে থেকে ঘরের পাশে কান পেতে শুনছিল। এই কেবল খক শব্দে তাদের কাছে এসে রাগী গলায় বলল, এই বাড়ি কি গানের আসরের জায়গা না। এখানে দেখছি মহান স্যারেও আছে, আসর তো হবেই? কোহিনুর একটা চেয়ার আমির আলীর সামনে দিয়ে বলল, চাচা বসেন। আমি বসতে আসি নাই। শোনো আমি যেন আর গানের আওয়াজ না পাই। সে এ কথা বলে চলে গেল। আমির আলী বদ প্রকৃতির একজন মানুষ। যেখানে ভালো সেখানে অমঙ্গল করা তার ভীষণ একটি বদ অভ্যাস। তাছাড়া কোহিনুরদের তেমন ভালো চোখে দেখে না।

দুদিন পর। আলেয়া খাতুন দীঘিতে জামাকাপড় ধুচ্ছে। পেছন থেকে আজহার উদ্দিন হেঁটে আসছে। আলেয়া খাতুনের দিকে চোখ পড়তেই হাঁটা ধীর হয়ে গেল।

আলেয়া খাতুন তিন সন্তানের জননী হলেও দেখতে এখনো সুশ্রী। কুৎসিত নজরে দেখতে দেখতে চেহারা নিমিষে নির্মল করে পেছন থেকে সালাম দিল।

ভাবি, আসসালামু আলাইকুম কেমন আছেন আমি আজহার?

আলেয়া খাতুন পেছন ফিরে তাকিয়ে বলল, ভালো। দিল্লি থেইকা কবে আসলেন?

এখন আর সেখানে থাকি না, আমার ছেলের মা ও ছেলে এখনো থাকে। সেখানে আমার বিরাট বাণিজ্য মা-ছেলে সামলায়। ভাইকে দেখি না, ভাই কোথায়? সে হাটে। আলেয়া খাতুন কাপড় ধোয়া শেষ করে উপরে উঠে এলো। বাড়ির ভেতরে যেতেই আজহার উদ্দিন ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বের করে বলল, এটা কাশ্মিরি শাল। নরম কণ্ঠস্বরে কথা বলছে আর বারবার আলেয়ার শরীরের দিকে তাকাচ্ছে। এই কেবল আজিজুল বাজার থেকে চলে এলো, তাদের সাথে দেখা। হাসিমুখে বলল, আজহার কেমন আছো? হঠাৎ আবির্ভাব, এদিকে আসা একেবারে ভুলে গেছ, চলো ভেতরে চলো। আজহার উদ্দিন বাড়ির ভেতর ঢুকতেই চোখ পড়ল কোহিনুরের দিকে। আজিজুলের দিকে তাকিয়ে বলল, কে এনি? আমার বড় কন্যা কোহিনুর। বিবাহের সম্বন্ধের কথা চলছে, বলো মাশাল্লাহ। আজহার দুপুরের খাওয়া-দাওয়া কোহিনুরদের বাড়িতে করল। আলেয়া খাতুন চা বানিয়ে নিয়ে এলো। আজহার কোমল স্বরে বলল, ভাবি বসেন, ভাইজান আমি একটা বিরাট আশা নিয়া এই মহান বাড়িতে। দানকারী আমাকে কোনো কিছুর অভাবে রাখে নাই, সব তার দয়া।

আজহার এই সুযোগ যে কোনো উপায় নিতে চাচ্ছে। কোহিনুর বিবাহের উপযুক্ত এ কথা আজহারের জানা ছিল না, শোনার পরে তার মন পরিবর্তন করল। বদ মনে বৈচিত্র্যের সীমা নেই। আজহার আজিজুলের হাত ধরে বলল, আমার বাবার ও আমার নিতান্ত আশা এই বাড়িতে আত্মীয়তা করা। আমার পুত্র দুই লক্ষে একজন, দেখতে ইংরেজের বাচ্চা। স্বভাব চরিত্র মাশাল্লাহ, সব আল্লাহ? পাকের কৃপা। আমার পুত্রের জন্য কোহিনুরকে যদি দান করেন। না বলবেন না নিদারুণ শোক পাব ভাইজান। ব্যাগ থেকে পুত্রের একটি ছবি বের করে বলল, দেখেন ভাবি দেখেন, দেখলে না বলা যাবে না।

এভাবে তাদের মধ্যে কথাবার্তা চলতে থাকে। কিছু দিনের মধ্যে লোক মুখে জানাজানি হয়ে গেল, আজিজুলের কন্যার সাথে আজহারের ছেলের বিবাহ হয়ে গেছে। এ কথা শোনার পর আজ সন্ধ্যা থেকে আলেয়া খাতুন অত্যন্ত অস্থির হয়ে আছে। আজিজুল ঘরে নেই, এলেই কিছু একটা হবে। এমন নিছক মিথ্যা কথা কেন কারা ছড়াল? এখন রাত সাড়ে আটটা, আজিজুল এই কেবল ঘরে এলো। কোমল স্বরে বলল, কোহিনুরের মা এক গ্লাস জল দাও। সে জল নিয়ে এলো, মুখ মলিন হয়ে আছে কিছু বলছে না। আজিজুল তার দিকে তাকিয়ে বলল, কিছু বলবা? আলেয়া খাতুন রাগী গলায় বলল, মেয়েকে নাকি বিবাহ দিছো? এ কথা আমিও লোকমুখে শুনলাম। কোহিনুর এই কেবল বাবার পাশে এসে বসল। বাবা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, মা তোমার সাথে একটা পরামর্শ। তুমি অনেক বড় হয়ে গেছ সব কিছু বোঝ, আজহারের ছেলের সাথে যদি তোমার বিবাহ দেই এটা কেমন হবে? কোহিনুর সহজ ভাবে জবাব দিল, আপনি যা ভালো মনে করেন। সে এ কথা বলে বাবার কাছ থেকে চলে গেল। বাবা বলল, কোহিনুরের মা লাইট দাও স্যারের সঙ্গে দেখা করে আসি। মা লাইট এনে তার হাতে দিল। বাবা লাইট হাতে গফুর সাহেবের বাড়ি চলে গেল। স্যার, বাড়িতে আছেন? কে আজিজুল? আসো ভেতরে আসো। আজিজুল তার কাছে সব কথা খুলে বলল। গফুর সাহেব সিদ্ধান্ত দিলো কোহিনুরকে আজহারের ছেলের সাথে বিবাহ দেয়া হবে। যে কথা লোক মুখে ছড়িয়ে পড়েছে তাতে সেখানে বিবাহ দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। আজহার সফল হলো। কেননা কোহিনুরের বিবাহের খবর লোকমুখে ছড়িয়েছে আজহার নিজেই। এভাবে চলে গেল কয়েক দিন, আজ পনেরো তারিখ। খুব ভোরবেলা থেকে কোহিনুরদের বাড়িতে বিবাহের আমেজ। কেউ রান্নাবান্নার কাজে ব্যস্ত, কেউ ঘরবাড়ি সাজসজ্জার কাজে। গতকাল আজিজুল বাড়ির সকলকে দাওয়াত দিয়েছে, বিশেষ করে আমির আলীকে। কিন্তু সে পরিষ্কার জানিয়ে দিলো বিবাহে সে আসবে না। দুপুর হতেই আজহার বরযাত্রী নিয়ে চলে এলো সকলকে আপ্যায়নের কাজ চলছিল, এমন সময় একদল পুলিশ এসে হাজির। ওসি সাহেব বললেন, আজিজুল কে আজিজুল? গফুর সাহেব এগিয়ে এসে বলল, স্যার সে ভেতরে আসেন বসেন। আমরা বসার লোক না। আমাদের কাছে খবর আছে মেয়ের বিবাহ, এক বছর বয়স কম। তারে ডাকেন থানায় চলেন। আজিজুল এই কেবল বাইরে এসে ওসি সাহেবকে বলল, স্যার, আমার কন্যার বিবাহের বয়স থেকে সাত মাস বেশি আছে। আমাদের চোখে ধুলা দেবা না, থানায় চলো। কোহিনুরের বয়সের প্রমাণাদি দেখানোর চেষ্টা নিয়ে কাজে আসেনি। শেষমেশ পুলিশের এক ব্যক্তি গফুর সাহেবের কাছে বলল, স্যার কিছু বোঝেন না হাজার বিশেক টাকা দেন মামলা শেষ। অনেক অনুরোধ করে পনেরো হাজার টাকায় পুলিশ চলে যায়। এভাবে কোহিনুরের বিবাহ সম্পন্ন হয়। কয়েক দিন পরে আজিজুল শহরে চলে গেল। কোহিনুর বেশ আরাম-আয়েশে আছে, তার স্বামী এখন দিল্লি থাকে। মাঝেমধ্যে কোহিনুর তার স্বামীর কাছে পত্র লিখে, এভাবে তাদের মধ্যে একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এদিকে আজহার ঘন ঘন আলেয়াদের বাড়িতে আসা-যাওয়া শুরু করে। এ বিষয়টি আলেয়া খাতুনের কাছে অত্যন্ত বিরক্তিকর। কেননা রাতে দুই কন্যা ঘুমিয়ে গেলেই সঙ্গে সঙ্গে আজহার হাজির। নানা কিসিমের রং-ঢং করে কথা, এতে কন্যাদের ঘুম ভেঙে যায়। এভাবে চলে গেলো এক বছর। আজহার গভীর এক রাতে আলেয়া খাতুনের বাড়িতে এলো, অনেকক্ষণ দরজা ঠকঠক শব্দ। আলেয়া খাতুনের ঘুম ভেঙে গেলেও কোনো সাড়া দিচ্ছে না। তার ধারণা সাড়া না পেয়ে সে চলে যাবে। কিন্তু সে যাচ্ছে না, দরজার ঠকঠক শব্দ আগের থেকে বাড়িয়ে দিয়েছে। আলেয়া খাতুন কিছুক্ষণ পরে বলল, কে ওখানে? আমি আজহার। ভাই বাড়ি চলে যান কোহিনুর একা। দরজা খোলেন গঞ্জে থেকে একটা শাড়ি এনেছি নেন। দিনে আসেন, এই কথা বলে সে চুপ হয়ে থাকল অনেকক্ষণ। কিছুক্ষণ পরে আবার দরজায় খটাখট শব্দ। আলেয়া খাতুন ভয়ে ভয়ে দরজা খুলে তাকে চেয়ারে বসতে দিলো। আলেয়া খাতুন মৃদু স্বরে বলল, আমাদের যা আছে আলহামদুলিল্লাহ আমরা এতেই সন্তুষ্ট। আপনার ছেলে আমার আদরের জামাই। আপনি আমাদের পরম আত্মার আত্মীয়, কিন্তু একি শুরু করেছেন? এটা পাপ, আপনি যখনি আসেন আমার শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকেন, কুৎসিত কথায় মগ্ন হন, এগুলা পাপা। আমি ওই কিসিমের মহিলা না। আপনার বিষয় কোহিনুরের বাবারে জানানো হইছে, সে বলেছে আমাদের বাড়িতে আপনাকে আর না আসতে। আজহার রাগান্বিত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পথে দেখা হলো আমির আলীর সাথে। আমির আলী রাগী গলায় বলল, তোমাকে দিয়ে কি হবে? বছর শেষ কিন্তু ফল কই? আজহার চোখ বাঁকা করে বলল, আঙুল আর একটু বাঁকা করতে হবে, ফল অতি নিকটে। সে এটা বলে চলে গেল।

ভোর বেলা আজহার বাইরে থেকে এসে কোহিনুরকে ডেকে রাগান্বিত চেহারায় বলল, এত দিন কিছু বলি নাই দেখি এর একটা সমাধান হয় কিনা। কিন্তু তুমি এখন সীমা লঙ্ঘন করে ফেলেছ। পাশের বাড়ির হেমায়েতের সঙ্গে একি করেছ? ছিঃ, ছিঃ, মুখে আনাও পাপ। লোকের মুখ বন্ধ করবা কি দিয়া? হেমায়েতের দুই মাসের সন্তান তোমার পেটে। কোহিনুর তার কথা শুনে অচেতন হয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণ পর তার জ্ঞান ফিরে এলো। আজহার বলল, ভান ধরবা না, ভান ধরে কাজ হবে না। বাপের বাড়ি চলো, সালিশ বিচার হবে। তোমার বাপেরে খবর দেয়া হইছে। কোহিনুরকে তার বাবার বাড়িতে দিয়ে আসা হয়েছে। বাবা শহর থেকে বাড়ি চলে এলো। আজ সন্ধ্যায় গফুর সাহেব কোহিনুরকে দেখতে এসেছে, সবার মন খারাপ। গফুর সাহেব মলিন মুখে বললেন, আগামীকাল নাকি তারা সালিশ বাসাবে? আমার হাত বাঁধা, জানি সব মিথ্যা কিন্তু আমি একা কী করব? আজহারের পুত্রের সাথে আমার কথা হয়েছে, সে সাফ জানাল বাবা যা বলেছেন তা সব সত্য। আজিজুল কিছুক্ষণ থম দিয়ে কান্না ভেজা কণ্ঠে বলল, স্যার আমার কোহিনুরকে ওরা বাঁচতে দেবে না। ভোর হবার আগে ওদের লোইয়া দূরে কোথাও চলে যাই? তাই করো ওরা অত্যন্ত জঘন্য। আলেয়া খাতুন এই কেবল বাবার কাছে এসে বলল, কোহিনুরকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। বাবা তাকে খুঁজতে লাগল পরপর দুটি রুমে কোথাও কোহিনুর নেই। কোমল স্বরে ডাকতে লাগল, কোহিনুর ও কোহিনুর, কোনো জবান নেই। কোথায় গেল? খুঁজে খুঁজে বাবার ঘরে পেলো। কোহিনুর শুয়ে আছে। বাবা তার পাশে গিয়ে বসে কোমল স্বরে বলল, মা তোমাকে কষ্ট কি বুঝতে দেই নাই এখন তোমার চোখে জল? বাবা অনেক কথা বলে যাচ্ছেন কিন্তু সে কোনো জবাব দিচ্ছে না। বাবা আবার তাকে ডাক দিলো, কিন্তু কোনো সাড়া নেই। কোহিনুরের মাথায় আলতোভাবে হাত বুলাতে গিয়ে মাথা ঢলে পড়ল। ঠোঁটের কোণে সাদা লালা, বাবার বুঝতে আর বাকি নেই কান্না ভেজা কণ্ঠে আলেয়াকে ডাক দিয়ে বলল, সর্বনাশ হয়ে গেছে তোমরা কোথায় কোহিনুর বিষপান করেছে। আমার মা আর বেঁচে নাই, তোমরা কাকে বিচার করবা? তারা সকলে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। রাত এখন আড়াইটা আজিজুল বলল, স্যার আমি এখন রওনা দেব। কোথায় যাবা? বাবা কোনো জবাব না দিয়ে কোহিনুরের মৃতদেহ কাপড়ে ঢেকে দিয়ে ভ্যান গাড়িতে উঠিয়ে নিলো। তারা চলে যেতে লাগল পেছনে আর ফিরে তাকাল না।

জুলকার নাইন

এপ্রিল / ২২ / ২০২১
১১:২৭ অপরাহ্ন

আপডেট : জুলাই / ২৫ / ২০২১
০৭:৩৩ অপরাহ্ন

সাহিত্য