মে / ১৮ / ২০২২ ০৩:১০ অপরাহ্ন

জুঁই ইসলাম

এপ্রিল / ১৮ / ২০২১
০২:৫০ পূর্বাহ্ন

আপডেট : মে / ১৮ / ২০২২
০৩:১০ অপরাহ্ন

শশুর বাড়ির ইফতারকে না-বলুন



408

Shares

লকডাউন দিয়েই এবারের রমজানের শুরু সবই আল্লাহর ইচ্ছা। চলুন সকল মুসলিম এক হয়ে এ রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করি এবং আল্লাহর সান্নিধ্য কামনা করি। মহামারি থেকে পানাহ চাই। রমজান মাসটা হলো পূণ্য অর্জনের এক মহান মাস। রমজানের সাথে ইফতার আয়োজনটা আমাদের সংস্কৃতিতে বেশ জনকালো ব্যপার। সারাদিনের রোজা ভঙ্গ করা হয় ইফতারের মাধ্যমে যার যার সামর্থ অনুযায়ী। কেউ বিশাল আকার টেবিল সাজিয়ে রাখেন ইফতারের আগ মুহুর্তে আবার কেউবা সামান্য একটা খেজুর ও পানি দিয়েই ইফতার সারেন। যার যার সামর্থ অনুযায়ী রোজাদারেদের ইফতার করা ধর্মীয় দৃষ্টিতে অবশ্যই কর্তব্য ও সওয়াবের কাজ।

রোজার সাথে ইফতারের সম্পর্ক অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। এ মাসের একটি এবাদতের মুল্য অন্য মাসের সত্তরটি এবাদতের মূল্যের সমান অর্থাৎ এ মাসে একটি এবাদত করলে এর সওয়াব মাসের সত্তরটি সওয়াবের সমান। এছাড়া পবিত্র কুরআন শরীফ এ মাসেই অবর্তীন হয়েছে আর পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, রোজা হলো আল্লাহর পরম সান্নিধ্য লাভের প্রধান উপায়। মুসলমানদের আচার ব্যবহার, সংযত কথাবার্তা, দান খয়রাত ইত্যাদি রমজান মাসে একটা আলাদা শান্তিময় পরিবেশের সৃষ্টি করে। এত কথা বলার কারন হলো বর্তমানের ইফতার প্রথা- ইফতার রোজার একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। রোজাদারকে ইফতার করানো সুন্নত ও অনেক পূণ্যের কাজ। রমজানে মুসলমান আত্মীয়স্বজনরা তথা গরীবদের ইফতার প্রধান করেন। এতে একদিকে যেমন সৃসম্পর্ক বজায় থাকে, অন্যদিকে একটা শান্তিপূর্ন সৌহাদ্যময় পরিবেশেরও সৃষ্টি হয়। সামর্থ অনুযায়ী প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজ খুশি মতে ইফতার করাতে পারেন। এর কোনও ধরা বাঁধা নিয়ম নেই।

কিন্তু বর্তমানে মেয়ের শশুর বাড়ি ইফতারটা দেওয়াটা গ্যাসট্রিক আলসারের মত একধরনের ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে আর তা বিশেষ করে সিলেট এর প্রচলন খুব বেশি যা হয়তো অন্য জেলাগুলোতে কম। বিশেষ করে মেয়ের শশুর বাড়িতে ইফতার পাঠানো যেন একটা প্রতিযোগিতার বহর দেখা যায় রমজান মাস এলে।  প্রয়োজনের চেয়ে অধিক খাদ্যসামগ্রী পাঠানো যেন একটা গর্বের বা সম্মানের ব্যাপার এমনটাই মনে করেন অনেকে ধনাট্য ব্যক্তিরা, আর নতুন বিয়ে হলে তো কথাই নেই দু‘তিনবার ইফতার সামগ্রী পাঠানো যেন একটা রেওয়াজে পরিণত হয়ে গেছে। যে বাবার অনেক আছে তিনি মেয়ের শশুর বাড়িতে ২/৩ বার ইফতার পাঠিয়ে যেমন বেয়াইর রাড়িতে তার মুখ উজ্জ্বল করেন ঠিক তেমনি মেয়ের জামাইও মহাখুশীতে থাকেন তার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্ব-জনকে আপ্যায়ন করিয়ে, সামাজিক স্ট্যাটাস বাড়ান বন্ধু বা আত্মীয় মহলে। কিন্তু যে বাবা গরীব, অসহায়, কিংবা মধ্যবিত্ত তাঁর জন্য রমজান মাসটি বেশ কষ্টের , হতাশার মাস, আফসোসের মাস, নীরবে চোখে পানি ফেলার মাস। কিন্তু কেন আমরা তো জানি এ মাস রহমতের মাস শান্তিপূর্ণ মাস তবে কেন আমাদের সমাজে এই পবিত্র মাসে মুসলমানে মুসলমানে বৈষম্য মুলক ব্যবহার ? কিছু সমাজপতি, শিল্পপতি, ধনাট্য ব্যক্তিবর্গের গড়ে তোলা সামাজিক নিয়ম কানুনে অসহায় গরীব পিতারা আজ বলি হচ্ছেন এই কুসংস্কার নিয়ম কানুনে। কত অনহায় পিতা ঋন করে কিংবা বড় লোক আত্মীয়ের কাছে হাত পেতে টাকা জোগাড় করে মেয়ের বাড়িতে ইফতার পাঠান। একবার এই বাবা-মায়ের কথা বিবেক দিয়ে ভাবুনতো এটা তাদের উপর কতটা জুলুম নয় ? শুধু কি ইফতার ? ইফতারের সাথে থাকতে হয় নতুন কাপড়ও যদি মেয়েটার নতুন বিয়ে হয়ে থাকে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গরিব কন্যাদারগ্রস্ত পিতা-মাতারা। এমনিতেই বাজারে দ্রব্যমূল্যের চড়াদাম। ফলে হয়ত কোনও গরীব পিতা-মাতাকে মেয়ের বাড়িতে অনেক কষ্টে টাকা সংগ্রহ করে ইফতার পাঠাতে হয়। ভালোভাবে ইফতার পাঠাতে না পারলে যদি মেয়েকে শশুরবাড়ির লোকের লাঞ্ছনা-গজ্ঞানা সইতে হয়, এই ভয়েই বাধ্য হয়েই ইফতার পাঠাতে হয় পিতাকে। ভালভাবে ইফতার সামগ্রী পাঠাতে না পারলে যদি সমাজের কাছে নববধুকে বা তার পরিবারের লোকদের হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়, যা এতদঞ্চলে অহরহ ঘটছে।

এদিকে ইফতার পাঠাতে গিয়ে হয়ত সেই পরিবারের সদস্যদের বা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ঈদের জামাকাপড় বা খাদ্য সামগ্রী জোটানোও মুসকিল হয়ে পড়ে অনেক ক্ষেত্রে। ফলে ঈদের আনন্দ ¤øান হচেছ সেসব পরিবারের। আর অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, এর ফলে সত্যিকার অর্থে আমরা ইফতারের প্রকৃত তাৎপর্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছি দিন দিন। 

আমার প্রশ্ন হলো- কে এই নিয়মগুলো বের করেছে ? কেউ কি জানেন? হয়তবা বলবেন ইতিহাস। কিন্তু বর্তমানে যারা খুব নিয়ম করে মেয়ের বাড়ি থেকে এসব ইফতার সামগ্রী আদায় করেন, এগুলোর পক্ষ নিয়ে কথা বলেন তাদের কাছে আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে-আপনারা তো বলেন এগুলো সমাজের সৌন্দর্য, সমাজে সুন্দরভাবে বসবাস করতে হলে সামাজিক নিয়ম কানুন মেনে চলতে হয়। ভালো কথা, খুবই ভালো কথা কিন্তু সমাজের সৌন্দর্য রক্ষার জন্য শুধু মেয়ের বাবা-মাকে কেন ভোগান্তির কিংবা কষ্টের স্বীকার হতে হবে ? ছেলের বাড়ি থেকে কেন আদান-প্রদান হয় না ? মেয়ের বাড়ির বাবা-মা যদি ছেলের বাড়ির গুষ্ঠিকে ইফতার খাওয়াতে পারেন তবে ছেলের বাড়িরও উচিত মেয়ের বাড়ির গুষ্ঠিকেও ইফতার খাওয়ানো। এক পক্ষ শুধু গাড়ি বোঝাই করে ইফতার পাঠাবেন আর অন্য পক্ষ আরামে আরামে খাবেন তা কি করে হয় ? দু‘পক্ষ সমান ভাবে ইফতার আদান-প্রদান করেন তবেই না সমানে সমান হবে, সমাজ সুন্দর হবে।

হযরত মোহাম্মদ (স.) আরফার ময়দানে বিদায়ী হজের শেষ বক্তব্যে তাঁর উম্মতদের উদ্দেশে বলেছেন, সেটা হলো কোনও মুসলমানের কাছেই কোনও মুসলমানের দেওয়া জিনিষ ততসময় পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য হবে না যতসময় পর্যন্ত সে নিজ ইচ্ছায়, স্ব-ইচ্ছায় বা মুক্তমনে তা দিচ্ছে। জোর করে কেউ কারও উপর কোনও কিছু চাপিয়ে দিতে, আদায় করতে পারবে না। ইসলামে জোরাজুরি, জবরদস্তির কোনও বিধান নেই। তাই ইফতার নিয়েও আমাদের এরূপ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। এ বিষয়ে প্রত্যেক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন, সচেতন নাগরিক তথা এতদঞ্চলের এগিয়ে আসতে হবে। ইফতার প্রথাটা যাতে বাধ্যতামূলক না হয়, সে-বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। সুখের কথা হলো, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় বিভিন্ন সংগঠন তথা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সচেতন নাগরিকের এ প্রথা রোধ করতে অনেকটাই সমর্থ হয়েছেন। আর জনসাধারণেরও এতে মিলে স্বতঃস্ফুর্তি সমর্থন। বলতে দ্বিধা নেই, একমাত্র বাঙালি মুসলিম সমাজেই ইফতারি প্রথাটা বাধ্যতামূলক বা নিয়মে পর্যবসিত হয়েছে। তাই ইফতারি প্রথা রোধ করাটা প্রয়োজন অবিলম্বে। আমার কথায় হয়ত কেউ কষ্ট পেতেও পারেন, কিন্তু আমার কথাগুলো একবার বিবেক জাগ্রত করে ভাবুন। আমি চাই আমাদের সামাজিক বন্ধনটা সু-সম্পর্কে বজায় থাকুক প্রতিক্ষেত্রে। আমরা কেই কাউকে ছোট করে  না ভাবি, কেউ যেন কাউকে মনোকষ্ট দিয়ে কিছু স্বার্থ আদায় না করি। ধনীরা এই ইফতার প্রথা মেনে চলেন বলেই গরীবদের ভোগান্তি হয়। যাঁরা সামর্থবান তাঁরা যদি পদক্ষেপ নেন এই অনিয়মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান তাহলে অবশ্যই সম্ভব এই ইফতার প্রথাকে না বলা। আমি  চারিপাশের এসব অত্যাচার, অনিয়ম দেখে খুব বিচলিত হই। করোনার কারনে দেশে অভাব-অনটন বেড়েই চলেছে ঘরে ঘরে যেহেতু সব মানুষের কাজ-কাম বন্ধ তারপরওসমাজের মধ্যবিত্ত, নি¤œবিত্ত এই শ্রেণীর মানুষগুলো আজ করোনার কারণে প্রায় অর্থনৈতিকভাবে ভেঙ্গে পড়ছে তাই সামাজিক এসব প্রথা বন্ধ হওয়া অতীব জরুরি। এইবার করোনার কারনে হয়তো এসব লেনদেন ্এবার কম হতে পারে।

করোনা কালিন সময়ে সামর্থবানদের উচিৎ মেয়ের বাড়িতে ইফতার না দিয়ে অসহায় গরীব লোকদের পাশে দাঁড়ানো। প্রতিবারই তো লোক দেখানো সমাজে মেয়ের বাড়িতে ইফতার পাঠিয়ে সুনাম কুঁড়ান আর ঢেকর তুলেন এবার না হয় একটু ব্যতিক্রম করেন। আপনার বাসার বিলাশি ইফতার ত্যাগ করে এলাকার গরীব দুস্থদের ইফতার বিলিয়ে দিন। এতে অসহায় মানুষের মুখে যেমন হাসি ফোঁটবে তেমনি আল্লাহও খুশি হবেন। আল্লাহ চাইলে মুহুর্তেই করোনা নামক মহামারি থেকে মানব জাতিকে রক্ষাও করতে পারেন। তিনিই তো মহান। মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত হোক সমাজের প্রতিটি মানুষের। শেষবারের মত বলছি বিবেককে জাগিয়ে তোলুন মেয়ের বাবা-মার কথা একটিবার ভাবুন। শশুর বাড়ির ইফতারকে না-বলুন।


জুঁই ইসলাম

এপ্রিল / ১৮ / ২০২১
০২:৫০ পূর্বাহ্ন

আপডেট : মে / ১৮ / ২০২২
০৩:১০ অপরাহ্ন

পাঠকের কথা