জুলাই / ২৫ / ২০২১ ১০:২০ অপরাহ্ন

সাইফুল ইসলাম বেগ

জুন / ১৫ / ২০২১
০৬:২৯ অপরাহ্ন

আপডেট : জুলাই / ২৫ / ২০২১
১০:২০ অপরাহ্ন

পাঁচ পীরের মোকামের ‘রহস্যময়’ হিজল



86

Shares

অধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেটের পরতে পরতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পীর-আউলিয়া, দরবেশের মাজার ও নানা স্মৃতি চিহ্ন। এ অঞ্চলে ধর্ম প্রচারকালে বিভিন্ন এলাকায় তাদের সাময়িক বিশ্রামের স্থানও পেয়েছে ‘মোকাম’র খ্যাতি। অস্থায়ী বিশ্রামের এসব জায়গাকে স্মরণীয় করে রাখতে, ভক্তরা তা সংরক্ষণ করেছেন প্রার্থনার স্থান হিসেবে। তেমনি এক স্থানের নাম ‘পাঁচ পীরের মোকাম’।

সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার সাদীপুর ইউনিয়নের লামা গাভুরটিকি গ্রামে ঐতিহাসিক এ মোকামের অবস্থান। মোকামের অপার রহস্য একাধিক প্রচীন হিজল গাছ। গোড়া থেকে শাখা-প্রশাখায় অগুণতি বড় বড় ছিদ্র নিয়ে অর্শ্চযজনকভাবে যুুগের পর যুগ, কালের স্বাক্ষী হিসেবে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে গাছগুলো। 

পাঁচ পীরের মোকামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের উত্তর-পশ্চিম দিকে প্রায় ১শ’ ৪২ শতক জায়গা নিয়ে মোকামের অবস্থান। উঁচু জায়গায় রয়েছে একটি মাজার রকম স্থাপনা। এটি মাজারের জনৈক মহিলা খাদেমের কবর বলে জানা যায়। এর পাশেই বড় গাছের গোড়ায় দেখা যায়, প্লেট ভর্তি রাখা গভীর দুধ। তার ডান পাশে পাঁচ পীরের পরিত্যক্ত দীঘি। আছে ইবাদতের পাকা ঘর। বাঁ পাশেই সমতল জায়গায় দৃষ্টিনন্দন সবুজ হিজল বাগান। এখানে রয়েছে প্রায় একই রকমের ছোট-বড় ১৪টি প্রাচীন গাছ। প্রত্যেকটা গাছেরই গোড়া থেকে শাখা-প্রশাখায় অসংখ্য বড় বড় ছিদ্র। কোনো গাছের পুরো গোড়ায়ই ছিদ্র। চালের উপর দাঁড়িয়ে আছে গাছ। কোনোটির আছে নামমাত্র শেকড়। কোনোটির আবার মধ্যখানে দু’ভাগ। দেখা যায় এপাশ-ওপাশ। তবুও যুগের পর যুগ ‘রহস্যজনক’ভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে এ হিজল বাগান। কেবল হিজলই নয় মোকামের অন্যান্য গাছগুলোও একই রকম ছিদ্রে ভরপুর। 

গাছের গোড়ার ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করে মগডাল দিয়ে অনায়াসে বেরিয়ে যেতে পারবে যে কোনো সরীসৃপ প্রাণী। কথিত আছে, হিজল বাগানের গাছে গাছে বড়বড় বিষাক্ত সাপের বিচরণ। ভাগ্য ভালো হলে দেখা পাওয়া যায় তাদের। আজ অবধি তারা কারো ক্ষতি করেনি। মনবাসনা পূরণে, সাপের খাবার হিসেবে ভক্তরা গাছের গোড়ায় ও পুকুরে ছিটিয়ে দেন গাভীর দুধ। একটি নির্দিষ্ট গাছতলায় প্রতিদিন রাখা হয় প্লেট ভর্তি দুধও।

স্থানীয়রা জানান, সিলেটের সুফি সম্রাট হযরত শাহজালালের (রহ.) সফরসঙ্গী হযরত শাহ গরীব বা শাহ গাবরু (রহ.) এর আস্তানা ছিল এটি। একটি উঁচু টিবির উপর সাধনা করতেন তিনি। তার নামানুসারেই এই এলাকার নামকরণ ‘গাভুরটিকি’ করা হয়। এখানে বহুকাল পূর্বে ইসলাম প্রচার করতে আসা ৫ জন দরবেশের একটি কাফেলা সাময়িক আস্তানা গড়েন। একটি গাছের মাথায় লাল সামিয়ানা ঝুলিয়ে কিছুদিন অবস্থান করেন তারা। কেউ কেউ বলেন, এরাও ছিলেন হযরত শাহজালালের (রহ.) সফরসঙ্গী। তবে, শুরু থেকে সংরক্ষণ না হওয়ায় মোকামের সঠিক ইতিহাস নিয়ে এলাকায় নানা গল্প প্রচলিত আছে। কারো কারো ধারণা, ব্রিটিশ আমলে তারা (পাঁচ পীর) পারস্য থেকে এসেছিলেন। তবে এই পাঁচ পীরের নাম-পরিচয় ও আগমনের তথ্য নিশ্চিত করে বলতে পারেনি কেউ। 

গ্রামের মুরব্বি আবদুশ শহীদ ওরফে শাহীদ মিয়া (৭০) বলেন, পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শুনেছি এখানে পাঁচজন দরবেশ সাময়িক বিশ্রাম নিয়েছিলেন। এরপর থেকেই এটি মোকাম হিসেবে প্রসিদ্ধ। জন্ম থেকে একই রকম দেখছি মোকামের ঐতিহাসিক প্রত্যেকটি হিজল গাছ। আমাদের পূর্বপুরুষরাও বলেছেন, তারাও অনুরুপ দেখেছেন। অনেকটা শূন্যের উপর দাঁড়িয়ে থাকা মোকামের ছিদ্রবিশিষ্ট হিজল গাছগুলো এক অপার রহস্য। প্রতিবছর চৈত্র মাসের ১৩ তারিখ এখানে ভক্তরা জড়ো হয়ে পীরদের উদ্দেশ্যে ভক্তি-শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। 

মোকামের বর্তমান খাদেম মো. গেদু মিয়া (৫০) বলেন, পাঁচ পীরের মোকাম প্রাচীন ইতিহাস-ঐতিহ্য সমৃদ্ধ। এ মোকামের পুরো ইতিহাস জানা যায়নি। প্রায় ২০-২৫ বছর ধরে আমি দেখাশোনার দায়িত্বে আছি। মোকাম এলাকায় সাপের বিচরণ থাকায় গাভীর দুধই বেশি মানত করনে ভক্তরা। আর হিজল গাছগুলো মূলত এ মোকামের মূল আকর্ষণ।

সাইফুল ইসলাম বেগ

জুন / ১৫ / ২০২১
০৬:২৯ অপরাহ্ন

আপডেট : জুলাই / ২৫ / ২০২১
১০:২০ অপরাহ্ন

মফস্বল