মে / ০৭ / ২০২১ ০৯:১৭ পূর্বাহ্ন

শব্দনীল

এপ্রিল / ১৮ / ২০২১
০৪:০৫ পূর্বাহ্ন

আপডেট : মে / ০৭ / ২০২১
০৯:১৭ পূর্বাহ্ন

কবিদের কবি অমিয় চক্রবর্তী


11

Shares

‘হাত থেকে তার পড়ে যায় খসে অবশ্য আধলা ধুলোয়। চোখ ঠেলে খোলা অসাড় শূন্যে। প্রাণ, তুমি আজো আছ ঐ দেহে, আছ মুমূর্ষু দেশে।’

আধুনিক বাংলা কবিতার গোড়াপত্তন হয় মূলত তিরিশ দশক থেকে। এই গোড়াপত্তন যাদের হাত ধরে হয়েছে তাদের ভিতর অন্যতম অমিয় চক্রবর্তী। বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, জীবনানন্দ দাশ ও বিষ্ণু দের সাথে সাথে এই কবির নাম সমসাময়িকতার বিস্ময় জড়িত। তিনি ১৯০১ সালের ১০ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের হুগলিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পারিবারিক নাম ছিল অমিয় চন্দ্র চক্রবর্তী। তাঁর পিতা দ্বিজেশচন্দ্র চক্রবর্তী এবং মা অনিন্দিতা দেবী। অনিন্দিতা দেবী ছিলেন সাহিত্যিক। তিনি ‘বঙ্গনারী’ ছদ্মনামে প্রবন্ধ- নিবন্ধ প্রকাশ করতেন। শৈশবে মা এর কাছ থেকেই অমিয় চক্রবর্তী সাহিত্য- সংস্কৃতির দীক্ষা নিয়েছেন। 

‘অতন্দ্রিলা, ঘুমোওনি জানি তাই চুপি চুপি গাঢ় রাত্রে শুয়ে বলি, শোনো, সৌরতারা- ছাওয়া এই বিছানায় সূক্ষ্মজাল রাত্রির মশারি...’

অমিয় চক্রবর্তী দেখিয়েছেন উপমা ছাড়াও কবিতা হয়। তার কবিতার ছন্দ, শব্দ চয়ন, শব্দ ব্যবহারের কৌশল, পঙক্তি গঠনের নিয়ম বাঙালি কবিদের মধ্যে অনন্যসাধারণ। সংস্কৃত শব্দ তাঁর কবিতায় প্রবেশ করেছে অনায়াস অধিকারে। কবিতায় জাগ্রত চৈতন্যের সাথে সাথে অবচেতনার যে সদৃশ আছে তা তিনি দেখিয়েছেন সুনিপুণতায়। প্রথম দুটি কাব্যগ্রন্থ ‘কবিতাবলী এবং উপহার’ প্রকাশিত হলেও মূলত অমিয় চক্রবর্তী ‘খসড়া’ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে সাহিত্য জগতে প্রবেশ করেন। কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রপ্রভাব বর্জিত আধুনিকতার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। বুদ্ধদেব বসু অসংকোচে অমিয় চক্রবর্তীকে বলতেন ‘কবির কবি’। 

কবি আল মাহমুদ অমিয় চক্রবর্তী সম্পর্কে বলেছেন, ‘ঋণগ্রস্ত না করে করেছিলেন বিস্মিত ও অভিভূত। তার মিল ও পঙক্তি বিন্যাসের অনভ্যস্ত প্রয়োগ আমার কাছে কিছু দিন অত্যন্ত লোভনীয় মনে হলেও এর দুরূহতা শেষ পর্যন্ত আমাকে নিশ্চেষ্ট না করে ছাড়ে নি। এমন কী পয়ারের কারুকাজেও।’

আবদুল মান্নান সৈয়দও অমিয় চক্রবর্তীর সম্পর্কে বলেছেন, ‘তাঁর কবিতা একেবারেই অন্যরকম। কোন পোগান বা চিৎকৃত বাক্যের থেকে অনেক দূরে: মননাশ্রিত, অ্যাবস্ট্রাক্ট অথচ মমতার ঘন নিবিড়।’

‘বাঙলার মেয়ে, এসে ছিল তার জীবনের দাবি নিয়ে, দুদিনের দাবি ফলন্ত মাঠে, চলন্ত সংসারে; কতটুকু ঘেরে কত দান ফিরে দিতে। সামান্য কাজে আশ্চর্য খুশি ভরা। আজ শহরের পথপাশে তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে কোথা সভ্যতা ছোটে তেরোশো পঞ্চাশিকে।’

তাঁর কবিতার ভিতরে আবেগের সঙ্গে মিশে আছে মননশীলতা। প্রগাঢ় দার্শনিকতার মধ্যে অন্তর্লীন হয়ে আছে প্রবল সময় ও সমাজ- সচেতনতা। তিনি রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য বেশি পেলেও তার কবিতা ছিল সম্পূর্ণ রবীন্দ্রপ্রভাব মুক্ত। এই জন্যই তাকে বাংলা কবিতায় আধুনিকতার পথিকৃৎ পঞ্চপা-বদের একজন ধরা হয়। তিনি ছিলেন সৃজনশীল এক গদ্যশিল্পী। 

এই সৃজনশীল মানুষটির প্রকাশিত উল্লেখিত গ্রন্থ হচ্ছে- ‘এক মুঠো, চলো যাই, মাটির দেয়াল, অভিজ্ঞান বসন্ত, পুরবাসী, পালাবদল, দূরবাণী, পারাপার, পথ অন্তহীনসহ অন্যান্য। 

অমিয় চক্রবর্তী বাংলা সাহিত্যে অসমান্য অবদানের জন্য পেয়েছেন- ইউনেস্কো পুরস্কার, পদ্মভূষণ পুরস্কার, সাহিত্য একাডেমি পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কার। তিনি ১৯৮৬ সালের ১২ জুন মৃত্যুবরণ করেন।


সাহিত্য