মে / ১৮ / ২০২২ ০৪:৪৯ অপরাহ্ন

সৈয়দ হেলাল আহমদ বাদশা, গোয়াইনঘাট

জানুয়ারী / ১৫ / ২০২২
০৮:৩৬ অপরাহ্ন

আপডেট : মে / ১৮ / ২০২২
০৪:৪৯ অপরাহ্ন

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী উরা ঘর



110

Shares

আমন ও বোরো ধান মৌসুমে ধান আহরণ ও সংগ্রহে এক অভিন্ন দৃশ্যের সৃষ্টি হয় গ্রামবাংলার প্রতিটা মাঠে-ঘাটে। বিশেষ করে আমন ধান কাটার সময় আসলে অগ্রহায়ন, পৌষ ও মাঘ মাসে প্রতিটা গ্রামের মাঠে মন জুড়ানো দৃশ্য দেখা যায়।

হাওরের সন বা ধানের নেরা ও বাঁশ বেত দিয়ে কৃষকের থাকার জন্য অস্থায়ীভাবে তৈরি করা হয় বিভিন্ন ডিজাইনের ঝুপড়ি ঘর। অস্থায়ী হলেও টেকসই ও মজবুতভাবে তৈরি করা হয়। গোবরের সাথে পানি মিশিয়ে ধান ঝাড়াই মাড়াই ও শুকানোর জন্য তৈরি করা হয় ছোট্ট একটি মাঠ। আমাদের গ্রামের ভাষায় যাকে বলা হয় উরা ও খলা। 

কৃষকদের হাতে তৈরি করা দৃষ্টিনন্দন এই শিল্পকর্ম সহজে যে কারো মন কাড়ে। কৃষকের এসব শিল্পকর্ম প্রাকৃতিক পরিবেশকে আরো মোহনীয় ও সৌন্দর্য মন্ডিত করে তুলে। পাশাপাশি কৃষক-কৃষাণী থেকে শুরু করে গ্রামে বসবাসকারী সর্বস্তরের মানুষের মনে আনন্দের ঢেউ জাগায়। যদিও এটা অস্থায়ীভাবে করা হয় কিন্তু ওই সময় কৃষককের জন্য এটা ধান কাটা থেকে শুরু করে ঝাড়াই মাড়াই ও শুকানো পর্যন্ত মূল ঘর হিসাবে কাজ করে। গ্রামের কৃষক কৃষাণীর ওই সময় স্থায়ী বসতি ঘরের সাথে সম্পর্ক থাকে না বললেই চলে। আমন ও বোরো মৌসুমে দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত কৃষক কৃষাণীরা উরা ও খলায় ব্যস্ত সময় পার করেন। 

উরা হলো রাতে থাকার জন্য এবং কাজ করে একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য তৈরি করা ঘর। খলা হলো—ধান কেটে মাড়াই বা সংগ্রহের প্রথম পর্যায়ের প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করতে তৈরি অস্থায়ী উঠান। দিনে টানা পরিশ্রম করে যখন হাঁপিয়ে ওঠেন কৃষক তখন সেই অস্থায়ী খলাঘরে সাময়িক আশ্রয় নেন। শুধু তাই নয়, খলা ঘরে চলে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী তুকুত ঝা, দাড়িয়াবান্দা সহ ছোট্ট ছোট্ট শিশু-কিশোরের টুফা খাওয়া। এককথায় আনন্দ বিনোদনের একটি মাধ্যম হিসাবে কাজ করে খলা ও উরা ঘর। আনন্দের সঙ্গে আতঙ্ক, ভীতি ও হাহাকার জুড়ে থাকে ধানখলাকে ঘিরে। 

ধান খলার দৃশ্য কৃষি প্রধান বাংলাদেশের সকলেরই চিরচেনা। শত বছরের পরম্পরায় চলছে কৃষক জীবনের এই ধারা। কিন্তু বাইরের লোকসকল যারা, প্রথমে ধানখলা দেখে চোখ ফেরাতে পারেন না সহজে। তাদের চোখ আটকে যায় অলৌকিক মায়াজালে। স্থীর চাহনীতে নিজেরা অজান্তেই ডুব দিয়ে থাকেন। খলায় শুকানো ধানের স্তুপ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। কুলায় ধান ওড়িয়ে চিটা ছাড়াচ্ছে কমবেশি সকলেই। শুকানোর জন্য দেওয়া ধান নেড়ে দিচ্ছে কোমল পা। দেখলে বুঝা যায় ভাড়ালে তুলছেন যেনো ধানের বদলে জহরত।

এই মৌসুমে ধানখলা মুখরিত থাকে বেশি। আর মুখর করে যারা রাখেন তাদের প্রায় সবাই নারী। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যাদের শ্রমের মূল্যায়ণ প্রায় অনুপস্থিত। যা যুগযুগ ধরে দেশের আর্তনীতির মূল্যায়নের বাইরেই রয়ে গেছে।

আগে গরু-মহিষ দিয়ে মাড়াই কাজ করা হতো। এখন আর গরু, মহিষ দিয়ে মাড়াইকর্ম নাই বললেই চলে। মাড়াই মেশিন এসেছে। এখন মাড়াই মেশিনের যুগ। মেশিন দিয়েই মাড়াই দেওয়া হয়। রাতে মানুষ থাকেন উরা’য়। উরা মানে-ধানগাছ, ছাটাই, বাঁশ-বেত দিয়ে তৈরি অস্থায়ী ঝুপড়ি ঘর। বোরো মৌসুমেই এই উরা’র দেখা মেলে বেশি হাওরে আর আমনে গ্রামের মাঠে। মানুষ প্রযুক্তির সাথে সমান তালে পা ফেলে সামনে অগ্রসর হচ্ছে—মহিষ, গরু দিয়ে ঘুরে ঘুরে ধান মাড়াই, ধান শুকানোর খলা, খলার এক পাশে অস্থায়ী বসতি উরাঘর এসব আস্তে আস্তে নাই হয়ে যাচ্ছে। এসবের যে একটা কৃষকের শিকড় আগামী প্রজন্মের জন্য আর থাকছে না। না থাকুক।—আমরা তো অগ্রসর হচ্ছি! এটাই আপাতত বড় কথা। উরাও এখন আর আগের মত বাঁশ বেত দিয়ে দৃষ্টিনন্দন করে তৈরি হয় না। চটের যুগ তাই কোন ভাবে রাত কাটানোর জন্য চট দিয়ে একটা ঘর তৈরি করলেই হল। এভাবেই দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য গুলো।

সৈয়দ হেলাল আহমদ বাদশা, গোয়াইনঘাট

জানুয়ারী / ১৫ / ২০২২
০৮:৩৬ অপরাহ্ন

আপডেট : মে / ১৮ / ২০২২
০৪:৪৯ অপরাহ্ন

মফস্বল