জুন / ২৬ / ২০২২ ০৯:০৩ পূর্বাহ্ন

জৈন্তা বার্তা ডেস্কঃ

মে / ১৬ / ২০২২
১১:০০ অপরাহ্ন

আপডেট : জুন / ২৬ / ২০২২
০৯:০৩ পূর্বাহ্ন

গোয়াইনঘাট উপজেলাকে দুর্যোগপুর্ণ উপজেলা ঘোষণার দাবী



74

Shares

শোষণ বঞ্চনা থেকে মুক্তি,সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্রত নিয়ে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মত গোয়াইনঘাট উপজেলার জন সাধারণ ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল। উত্তরাঞ্চলের মধ্যে সর্ব প্রথম গোয়াইনঘাট জৈন্তাপুর শক্র মুক্ত হয়।এক বুক আশা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মানুষ অপেক্ষারত ছিল, দেশ স্বাধীন হলে ভাগ্য বদলাবে, সবার মুখে হাসি ফুটবে।কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেল, দেশ উন্নয়নের মহা সড়কে এগিয়ে গেল, দেশের দক্ষিণাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল সকল এলাকায় আধুনিক উন্নয়নের ছোয়া পেলে ও পিছিয়ে রয়েছে গোয়াইনঘাট উপজেলাবাসী। সিলেট থেকে উপজেলা সদরে যোগাযোগের সংযোগ রাস্তা হল সালুটিকর গোয়াইনঘাট সড়ক।এই রাস্তা দিয়ে জাফলং পান্তুমাই, বিছনাকান্দি পর্যটন কেন্দ্রে প্রতিদিন লাখো মানুষ যাতায়াত করলেও বর্তমানে উক্ত রাস্তা যেন এক মরণ ফাঁদ। হালকা বৃষ্টি হলেই ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে যায় অত্র রাস্তা। সিলেট শহরের সাথে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ভরাট হয়ে গেছে সারি, পিয়াইন, গোয়াইন নদী।গত এক সপ্তাহের বারি বর্ষণে বর্তমানে অবস্থা মোটেও ভাল নয়, বরং আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে । অবিরাম বৃষ্টি আর পাহাড়ী ঢলের কারণে পানি ক্রমশ: বিপদ সীমার উপরে বেড়েই চলছে। বাড়ছে মানুষের দুর্ভোগ। 

কর্মহীন লোকজন গৃহবন্দী হয়ে দিন কাটাচ্ছে।উপোস অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে দিন মজুর ও কর্মজীবী মানুষ। 

 অচল হয়ে গেছে জীবনের চাকা।হারিয়ে গেছে জীবনের চিরচেনা কোলাহল। নদী-নালা, খাল-বিল ভর্তি হয়ে  উপচে পড়া পানি এখন রাস্তা-ঘাট, খোলা মাঠ, গোচারণ ভূমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-সবখানে। বন্ধ হয়ে গেছে মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা । অস্তিত্বের জন্য লড়াই করছে পানি বন্ধী লোকজন  । জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বড্ড বিপদে দিন কাটছে  দুর্গত এলাকার লক্ষ লক্ষ অধিবাসীর।মানুষের পাশাপাশি গৃহ পালিত পশু-পাখিরও খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে  তীব্রভাবে।

সিলেট টু গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট রাস্তায় বর্তমানে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। গোয়াইনঘাট উপজেলার নিন্মাঞ্চল বিশেষ করে, রুস্তমপুর ইউনিয়নের বগাইয়া হাওর,দমদমা হাওর, পাতলিকোনা, কাটলি কোনা, ইটা চকি, গোজারকান্দি,কাঠালবাড়ী কান্দি, লামনী,দিঘির পাড়, লামা ইস্তি, টেকনাগুল,কুনকিরি, উত্তর খলামাধব, জামকান্দি, দহরগ্রাম,মাটিকাপা, উপর গ্রাম পশ্চিম জাফলংয়ের লুনি,  বুগইলকান্দি ও গাছরাউরা,আম বাড়ি, হাই ডর,আহার কান্দি, লেংগুড়া ইউনিয়নের বেলেংগুড়া হাওর,  তোয়াকুল ইউনিয়নের পুর্ব তোয়াকুল,ঘোড়া মারা, সিটিং বাড়ী, পুর্ব পেকের খাল, বৈঠাখাল, নন্দির গাও ইউনিয়নের শিয়ালা হাওর, কচুয়ার পাড়,চলিতা বাড়ি, আলীর গাও ইউনিয়নের নয়াগ্রামউত্তর, কাকুনাকাই, কাকুনাখাইখলা, হাওর পূর্ব দিঘীর পার গ্রাম সহ নিন্মাঞ্চল হাওর ও বাওর বেষ্টিত গ্রাম গুলোর শতকরা ৮০ ভাগ ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে। বৃদ্ধ, অসুস্থ রোগী এবং বাচ্চা সহ সাধারণ মানুষ ঘরের ছাদে, নৌকায়, মেঝেতে উচু টং বেধে, খাদ্যহীন, নিদ্রাহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। গোয়াইনঘাট উপজেলার ১২ টি ইউনিয়নের সাথে উপজেলা সদরের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ১২ টি ইউনিয়ন এখন পানিতে টইটুম্বুর। নেই পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র, ত্রান সহায়তা, উদ্ধার তৎপরতা এবং সাহায্য সহযোগিতা। 

পরিস্থিতি  যতটুকু খারাপ এবং যেভাবে আলোচিত হওয়ার কথা-সেভাবে আলোচনা হচ্ছে না।মানুষের দুর্ভোগের প্রকৃত চিত্র প্রচার হচ্ছে না মিডিয়ায় কিংবা সংবাদ পত্রের পাতায়।  নীতি-নির্ধারকরা কেমন যেন উদাসীন! পুরো উপজেলার মানুষ পানিবন্ধী, গৃহে আটকা পড়েছে অথচ মাত্র কয়েক কেজি চাল আর অল্প কিছু ত্রাণ দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা জনপ্রতিনিধিদের। পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট ক্ষয় ক্ষতি থেকে চিরতরে পরিত্রাণের কোন পরিকল্পনা নেই জন প্রতিনিধি, দায়ীত্বশীল প্রশাসন কিংবা এলাকার উচ্চ পর্যায়ের এলিট ব্যক্তিদের। প্রতি বছর বন্যা আসলে কিছু ত্রাণ বিতরণ করে ফেইসবুক এবং সোস্যাল মিডিয়ায় প্রচার করে অসহায় গরীবের ভাগ্যের সাথে খেলা করাই হল জন প্রতিনিধিদের কাজ।এভাবেই চলছে বছরের পর বছর।

সেই বৈশাখ মাসের একেবারে প্রথম দিকে এক দফা পাহাড়ি ঢল ’পাকা ধানে মই দিয়ে গেল’। মাটিতে পড়ে হাউ মাউ করে কেদে বুক ভাসাল গরীব কৃষক।

চোখের সে জল শুকাতে না শুকাতেই আবার আসলো পাহাড়ি ঢল, আরো বেশি শক্তি নিয়ে। বৃষ্টি যেন  ঝেঁকে বসেছে অনন্তকালের জন্য। সাথে বজ্রপাত আর নিয়মিত ঘুর্ণিঝড়। ইতোমধ্যে পানিতে ডুবে, বজ্রপাতে অনেকগুলো প্রাণহানি ঘটেছে। খাদ্য আর খাবার সংকটে মানুষের কষ্টের কোন কমতি নেই। উৎপাত বাড়ছে সাপের। বীজতলা ডুবে গেছে। বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।লন্ডভন্ড হয়ে গেছে এখানকার জন জীবন।কিন্তু এ বিপুল সংখ্যক দুর্গত মানুষের জন্য ত্রাণ কিংবা উদ্ধার প্রক্রিয়া যেভাবে হওয়ার কথা- সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে, মাননীয় মন্ত্রী ও জেলা প্রশাসক মহোদয়ের বরাদ্দকৃত সামান্য চাল ছাড়া সরকারীভাবে বড় ধরণের কোন ক্রাণ তৎপরতা দৃশ্যমান নয়। মুজিব বর্ষ উপলক্ষে দেশে শতাধিক নদী খননের জন্য সিদ্ধান্ত হলেও গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী ছোট ছোট নদী গুলো খননের কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি প্রশাসন। গোয়াইনঘাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রায়হান পারভেজ রণির তথ্য মতে এ বছরের বন্যায় গোয়াইনঘাট উপজেলার ১৫০০ হেক্টর জমির বুরো ফসল পানির নিচে তলীয়ে গেছে। 

জনপ্রতিনিধিরা বন্যাক্রান্তদের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন কিন্তু দেওয়ার মতো কোন সরকারী ত্রাণ তাদের হাতে নেই। এই ব্যাপারে বৃহত্তর জৈন্তিয়ার গণ মানুষের সংগঠন জৈন্তিয়া কেন্দ্রীয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মোঃ জামাল উদ্দিন বলেন, "  সিলেটের গোয়াইনঘাট , কানাইঘাট, জৈন্তাপুর, ও কোম্পানিগঞ্জকে অবিলম্বে ’দুর্গত এলাকা ঘোষণা’ জরুরী হয়ে পড়েছে।" তিনি আরো বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কর্তৃক প্রস্তাব প্রেরণ করে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের সমন্বয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে উক্ত এলাকাকে দুর্যোগপুর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা যেত। তিনি স্থানীয় সাংসদ, মাননীয় মন্ত্রী ইমরান আহমদকে এই ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ জানান।

’ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১২ এর ২২ এর (২) উপধারায়  বলা হয়েছে , ’(২) কোন অঞ্চলে সংঘটিত মারাত্মক ধরণের কোন দুর্যোগ মোকাবেলায় অতিরিক্ত ব্যবস্থা গ্রহণসহ উক্ত দুর্যোগের অধিকতর ক্ষয়ক্ষতি ও বিপর্যয় রোধে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরী ও আবশ্যক হইলে স্থানীয় পর্যায়ের কোন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, গ্রুপ বা সংস্থা অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার নিমিত্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারের নিকট সুপারিশ পেশ করিতে পারিবে।’ অর্থাৎ উপজেলা বা জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিকে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারের কাছে সুপারিশ করতে হবে। বন্যা দুর্গত উপজেলাগুলোর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি কিংবা জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিকে  অবিলম্বে সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করার জন্য আহবান জানাচ্ছি। এতে দুর্গত মানুষের উপকার হবে, ত্রাণ মিলবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই  উত্তর-পূর্ব সিলেটের বন্যা উপদ্রত এলাকাকে ’দুর্যোগপুর্ণ এলাকা ঘোষণা করার জোর দাবী জানাচ্ছি। 


লেখকঃ

প্রভাষক মোঃলুৎফুর রহমান 

সমাজ কর্মী 

জৈন্তা বার্তা ডেস্কঃ

মে / ১৬ / ২০২২
১১:০০ অপরাহ্ন

আপডেট : জুন / ২৬ / ২০২২
০৯:০৩ পূর্বাহ্ন

মফস্বল