মে / ১৭ / ২০২২ ০১:৪১ অপরাহ্ন

নাজমুল হুদা, শাবি

জানুয়ারী / ১৯ / ২০২২
০৯:২৪ অপরাহ্ন

আপডেট : মে / ১৭ / ২০২২
০১:৪১ অপরাহ্ন

আন্দোলনের ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কে অবনতি

ভিসির পদত্যাগ দাবিতে এবার আমরণ অনশনে শিক্ষার্থীরা



96

Shares

উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আল্টিমেটাম দেওয়ার পরও কোন সুরাহা না পেয়ে আমরণ অনশনের বসেছে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত ২৪ শিক্ষার্থী। অপরদিকে শিক্ষকদের একাংশ গতকাল বুধবারে বেশ সরব ছিল শিক্ষার্থীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মন্তব্য ও উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতির নিয়ে। ফলে আন্দোলনের কারণেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে বেশ অবনতি হয়েছে। দীর্ঘ ১সপ্তাহ ধরে চলমান আন্দোলনের বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকদের নিয়ে শিক্ষার্থীরা ‘কুরুচিপূর্ণ ও অশালীন’ মন্তব্য করেছে এমন অভিযোগে বিশ^বিদ্যালয়ের মুল ফটকে অবস্থান কর্মসূচি পালন ও মানববন্ধন করেছে শিক্ষকদের একাংশ। 

তাছাড়া ডিনবৃন্দ, কর্মকর্তা ও কর্মচারী সমিতি পরিস্থিতি সমাধানে প্রশাসনকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন। গতকাল বুধবার বিকাল ৩টা থেকে আমরণ অনশন শুরু করে শিক্ষার্থীরা। এর আগে সকাল থেকে ক্যাম্পাসে একত্রিত হতে শুরু করে শিক্ষার্থীরা। পরে দুপুর থেকে বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছে শিক্ষার্থীরা।

 জানা যায়, আব্দুল্লাহ আর রাফি, জাহিদুল ইসলাম অপূর্ব, আসাদুল্লাহ আল গালিব, শাহরিয়ার আবেদিন, আসিফ ইকবাল, জান্নাতুল নাঈম নিশাতসহ ১৫জন ছেলে ও ৯ জন মেয়ে শিক্ষার্থী এ আমরণ অনশন শুরু করেছে। অনশনরত শিক্ষার্থী আসাদুল্লাহ আল গালিব বলেন, যে ভিসি শিক্ষার্থীদের উপর গুলি মারে, বোমা মারে সেই ভিসি আমরা চাই না। বিশ^বিদ্যালয়ে এমন ঘটনা বিরল। তাকে আমরা অবাঞ্ছিত করেছি। সুতরাং এ উপাচার্যের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের অনশন কর্মসূচি চলবে । একইদিন দুপুরে আন্দোলনের বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকদের নিয়ে শিক্ষার্থীদের ‘কটূক্তিমূলক ও কুরুচিপূর্ণ’ মন্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করার প্রতিবাদে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের একাংশ বিশ^বিদ্যালয়ের মূল ফটকে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে মানববন্ধন করেছে। মানববন্ধনে শিক্ষকেরা বলেন, আমরা কারো পক্ষে বা বিপক্ষে কথা বলছি না। আমরা বলছি, এই যে শিক্ষার্থীরা, যারা আন্দোলন করছেন, তারা আমাদের বিষয়ে যে কটুক্তি, কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা ছড়াচ্ছে, এর প্রতিবাদে আমরা এখানে সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রতিনিধি হয়ে দাঁড়িয়েছি। আসলে শিক্ষার্থীদের যেসব মন্তব্য, তা শিক্ষকদের ওপর আসলে আক্রমণাত্মক ও অপমানজনক। এর প্রতিবাদে এখানে আমাদের দাঁড়ানো। আমাদের সাথে সকল শিক্ষকই আছেন, তাঁরাও এখানে এসে দাঁড়াবেন।

অপরদিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের প্রতিবাদ কর্মসূচি নিয়ে বলেন, কে বা কারা শিক্ষকদের কি বললো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কি পোস্ট করলো তার দায়ভার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা নেবে না। তাছাড়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মানববন্ধন ও অবস্থান নেওয়াই শিক্ষকদেরকে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে সাথে মনে করছে না। এসময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলেন, ভিসি পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলছে, চলবে।

এছাড়া বিশ^বিদ্যালয়ে গত কয়েকদিনে সংঘটিত অনাকাঙ্খিত ঘটনার প্রেক্ষিতে ও বিশ^বিদ্যালয় অস্থিতিশীল হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন বিশ^বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিনবৃন্দ। এমনকি ডিনবৃন্দ বিভিন্ন অনাকাঙ্খিত ঘটনায় বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষসহ বিভিন্ন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারী লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। কেননা উদ্ভুদ্ব পরিস্থিতিতে বিশ^বিদ্যালয়ের সুনাম ও মর্যাদা ক্ষুন্ন হচ্ছে। এমনকি শিক্ষক শিক্ষার্থীর সম্পর্কের চরম অবনতি হচ্ছে বলে বিবৃতিতে তারা জানান।

এমনকি গত মঙ্গলবার বিকালে বিশ^বিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের একাংশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক তুলসী কুমার দাস ও সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. মস্তাবুর রহমানের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলতে যান। এসময় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উপস্থিত শিক্ষকেরা একাত্মতা পোষণ না করলে শিক্ষার্থীরা কথা বলবেন না বলে জানিয়ে দেন। এ সময় শিক্ষকেরা একাত্মতা পোষণ না করলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষদেরকে শিক্ষকদের অবস্থানস্থল ত্যাগ করতে বলে। এসময় তখন শিক্ষকেরা সেই স্থান ত্যাগ করেন।

সব মিলিয়ে বিশ^বিদ্যালয়ে চলমান আন্দোলনের সমাধানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে আলাপচারিতা কুব বেশি দেখা যায় নি। শিক্ষকেরা দাবি করছেন শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদেরকে হেয় ও অপমানিত করে লেখা লেখি ও মন্তব্য করছে। এর ফলে শিক্ষর ও শিক্ষার্থীরা বিপরীতমুখী অবস্থানে রয়েছে।  

প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা একইদিন দিবাগত রাত ১০টার মধ্যে ২০০-৩০০ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত পুলিশি মামলা প্রত্যাহারের আল্টিমেটাম দেয়। এ দাবি না মানায় শিক্ষার্থীরা গতকাল দুপুর ১২টার মধ্যে উপাচার্যের পদত্যাগের আল্টিমেটাম দেয় শিক্ষার্থীরা। এতেও উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ পদত্যাগ না করলে একইদিন বিকাল ৩টায় আমরণ অনশনে বসেছে ২৪ শিক্ষার্থী।

এদিকে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বিশ^বিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি পরবর্তীতে সুবিধাজনক সময়ে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে গতকাল দুপুরে উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। উপাচার্য বলেন, ‘আগামী ২ ফেব্রুয়ারি বিশ^বিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উদ্ভুত পরিস্থিতির কারণে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে।’

এদিকে ‘যদি কোনো দোষ থাকে সে ক্ষেত্রে সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, তাই মেনে নেব’ বলে বিভিন্ন গণ মাধ্যমে জানিয়েছেন বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রতিনিধিরা গালাগাল সহ্য করে আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু শিক্ষার্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করছেন। আমাদের শিক্ষকরা এর আগে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গেলে তারা তাদের ফিরিয়ে দেন। উপাচার্য আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার যে ঘটনা ঘটেছে, সেটিতে আমি খুবই মর্মাহত। যখন তাদের দাবি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত চলে আসবে, তখন কে বা কারা পুলিশের ওপর এ হামলা করে তা খতিয়ে দেখা হবে।

উল্লেখ্য, শাবির বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রভোস্টের অসদাচরণের প্রতিবাদে গত বৃহস্পতিবার রাতে ওই হলের ছাত্রীদের মাধ্যমে সূচিত হয় আন্দোলন। গত শনিবার আন্দোলনরতদের ওপর ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। এতে নতুন মাত্রা পায় আন্দোলন। হলের প্রভোস্টের অপসারণ, অব্যবস্থপনা দূর, ছাত্রলীগের হামলার বিচার চেয়ে পরদিন রবিবার সকল শিক্ষার্থী আন্দোলনে সামিল হন। সেদিন উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করেন শিক্ষার্থীরা। তাকে মুক্ত করতে অ্যাকশনে যায় পুলিশ, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বাঁধে সংঘর্ষ। এতে শিক্ষার্থীসহ অর্ধশতাধিক আহত হন। পরে উত্তুঙ্গে ওঠে আন্দোলন। পরে গত সোমবার রাতে পুলিশ-শিক্ষার্থী সংঘর্ষের ঘটনায় দুই থেকে তিন’শ অজ্ঞাত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। মামলার এজাহারে পুলিশ লিখেছে, সেদিন শিক্ষার্থীরা পুলিশের ওপর গুলিও ছুঁড়েছিল। এর প্রেক্ষিতে এ মামলা প্রত্যাহারে আলটিমেটাম দিয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু তা না মানায় উপাচার্যের পদত্যাগের সময়সীমা হিসেবে ১২টা পর্যন্ত সময় বেধে আল্টিমেটাম দেয় শিক্ষার্থীরা। তাতেও পদত্যাগ না করায় গতকাল ৩টা থেকে আমরণ অনশনে বসেছে বিশ^বিদ্যালয়ের ২৪ শিক্ষার্থী। এমনকি আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দিনভর উত্তপ্ত ছিল শাবি ক্যাম্পাস। সকাল থেকে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে দফায় দফায় বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। 

নাজমুল হুদা, শাবি

জানুয়ারী / ১৯ / ২০২২
০৯:২৪ অপরাহ্ন

আপডেট : মে / ১৭ / ২০২২
০১:৪১ অপরাহ্ন

সিলেট