১৪ এপ্রিল ২০২১ ১১:৫৩ পূর্বাহ্ন     |    ই-পেপার     |     English
১৪ এপ্রিল ২০২১   |  ই-পেপার   |   English
ইনোভেটর : দ্যুতি ছড়ানো এক বাতিঘর
ইনোভেটর : দ্যুতি ছড়ানো এক বাতিঘর

মোঃ বদরুল ইসলাম শাকির

মার্চ ০২, ২০২১ ০৬:২৪ পিএম



স্বাধীনতার পর থেকেই নানাভাবে ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টা চলছিল। এর মধ্য বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে নতুন প্রজন্ম। বিকৃত ইতিহাস পাঠ্যসূচিতেও অন্তর্ভূক্ত করা হয় বিভিন্ন সময়ে। বিশেষ করে ২০০৫ সালের শেষের দিকটা ছিল অত্যন্ত ঘৃণিত পর্যায়ে।  তখন মহান স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টা চলে প্রতিযোগীতা দিয়ে। ঠিক সেই সময়েই জেগে উঠে ইনোভেটর। যার স্বপ্নদ্রষ্টা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রণবকান্তি দেব।

দেশকে এগিয়ে নিতে হলে এ দেশে প্রকৃত দেশপ্রেমিক তৈরী করতে হবে। আর এই দেশ প্রেমিক তৈরী করার একমাত্র উপায় হচ্ছে তরুণ প্রজন্মকে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানানো। এই বোধ থেকে জন্ম ইনোভেটরের। ইনোভেটর শিক্ষার্থীর মধ্যে আলো ছড়াবে। জানান দেবে সঠিক ইতিহাসের । তাই মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানাতে বইপড়ায় আগ্রহী করার স্বপ্ন শুরু।

২০০৬ সালে  'ইনোভেটর (জীবনমান উন্নয়ন প্রয়াসী সংস্থা) নামে সংগঠনের জন্ম লাভ হয়। 'জ্ঞানের আলোয় অবাক সূর্যোদয়!/এসো পাঠ করি / বিকৃতির তমসা থেকে/ আবিষ্কার করি স্বাধীনতার ইতিহাস' স্লোগানকে সামনে রেখে  সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্কুল, কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের বইপড়ায় আমন্ত্রণ জানানো হয়। বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় দেশের বই, মহান মুক্তিযুদ্ধের বই।

ইনোভেটর বইপড়া উৎসব অনুষ্ঠিত হয় তিনটি ধাপে। বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে বই বিতরণ, ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে পরীক্ষা,  স্বাধীনতার মাস মার্চে সমাপনী অনুষ্ঠান ও পুরুষ্কার বিতরণ। এ পর্যন্ত পড়ানো হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের কালজয়ী গ্রন্থগুলো - শহীদ জননী জাহানারা ইমামের 'একাত্তরের দিনগুলি', সেলিনা হোসেনের 'হাঙর নদী গ্রেনেড', হাসান আজিজুল হকের 'নামহীন গোত্রহীন', মেজর (অব:) কামরুল হাসানের ভূইঁয়ার 'জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা', মাহমুদুল হকের 'খেলাঘর', শওকত ওসমানের 'দুই সৈনিক', আনোয়ার পাশার 'রাইফেল রুটি আওরাত', শাহীন আখতারের 'তালাশ', সেলিনা হোসেনের 'গল্পটা শেষ হয়না', সৈয়দ শামসুল হকের 'নিষিদ্ধ লোবান', রাবেয়া খাতুনের 'মেঘের পরে মেঘ', রশিদ হায়দারের 'শোভনের স্বাধীনতা', আমজাদ হোসেনের 'উত্তরকাল', আনিসুর রহমানের 'একাত্তরের একদল দুষ্টু ছেলে' এবং শেখ মুজিবুর রহমান-এর  'অসামাপ্ত আত্মজীবনী'।

ইনোভেটর বইপড়া উৎসবে অংশ নিয়েছেন সাবেক  অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, জনপ্রিয় লেখক ড. জাফর ইকবাল,ইনোভেটর বইপড়া উৎসবের পরম বন্ধু দেশ বরেণ্য  কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন,  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. মোঃ আনোয়ার হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও গবেষক মেজর (অব:) কামরুল ইসলাম ভূইঁয়া, মুক্তিযোদ্ধা ও চলচ্চিত্র অভিনেতা আকবর  হোসেন পাঠান ফারুক, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. মোঃ সালেহ উদ্দিন, প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট আবেদ খান, কথাসাহিত্যিক, অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম,বিজ্ঞানী মোঃ জহিরুল আলম সিদ্দিকী, সিলেট জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান লুৎফুর রহমান সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে আসা বইপড়া উৎসব হচ্ছে না।  বৈশ্বিক করোনাভাইরাসের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনা করে এবারের (২০২০-২০২১ ইং) সালের আসরটি আয়োজন থেকে বিরত থেকেছে।

বৈশ্বিক মহামারিতে গৃহবন্দী সময়কে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগাতে ইনোভেটর আয়োজন করেছে অনলাইন বইপড়া প্রতিযোগিতা। প্রতি সপ্তাহে একটি বইয়ের পিডিএফ দিয়ে  প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।  তরুণ প্রজন্মের পাশাপাশি নানা বয়সী পাঠক এতে অংশগ্রহণ করেন।

ইনোভেটর প্রতিষ্টা লগ্ন থেকে এ পর্যন্ত স্কুল,কলেজ, মাদ্রাসার ১৪ হাজার ৪শ ৭৬ জন শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের বই পড়িয়ে আসছে।  ইনোভেটর বইপড়া উৎসব নিয়ে বহুল পঠিত জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় ছাপা হয়েছে বিশেষ ফিচার। ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনে বইপড়া উৎসব নিয়ে হয়েছে আলোচনা অনুষ্ঠান। বাংলাদেশ টেলিভিশনের 'চেনা-জানা' অনুষ্ঠানে হয়েছে ইনোভেটর নিয়ে বিশেষ আলোচনা এবং সময় টিভিতে হয়েছে ইনোভেটর বইপড়া উৎসব নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।

ইনোভেটর বইপড়া উৎসবের পরম বন্ধু প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেছেন, বই সংকটে সাহস যোগায়। বই মানবিক সমাজ গঠনের অন্যতম নিয়ামক। করোনাকালীন দুঃসময়ে গৃহবন্দী মুহুর্তকে বইপড়ার মাধ্যমে ইনোভেটর যেভাবে আলোকিত ও অর্থবহ করে তুললো তা সত্যি অনবদ্য।

সেলিনা হোসেন আরো বলেন, বর্তমান সমাজে যে মূল্যবোধের অবক্ষয় চলছে, আইন প্রয়োগ করে তা থেকে নিস্কৃতি পাওয়া যাবে না, সেজন্য প্রয়োজন জ্ঞান,নীতি ও প্রজ্ঞাবান প্রজন্ম, প্রয়োজন মানবিক-হৃদয়বান একটি তরুণ সমাজ। ইনোভেটরের এই বইপড়ানোর আন্দোলন সেই কাংখিত সমাজ গঠনে অনন্য ভূমিকা রাখতে পারে। ইনোভেটরকে নিজের প্রাণের সংগঠন মনে করি। ঢাকা থেকে ভার্চ্যুয়ালি অংশ নিয়ে বরেণ্য এ কথা সাহিত্যিক বলেন, মূল্যবোধের চর্চা পরিবার থেকেই শুরু হয় আর বই পড়ার মতো চমৎকার একটি বিষয়ে সন্তানদের উৎসাহিত করতে বাবা-মাকেও এগিয়ে আসতে হবে। কেননা, বই সকল জ্ঞানের আধার।

ইনোভেটর বইপড়া উৎসব-এর  নির্বাহী সঞ্চালক প্রণবকান্তি দেব বলেন, 'যারা কারণে, অকারণে তারুণ্যের দোষারোপ করেন, আমি আমার দেখা থেকে বলি, এদেশের কিশোর - তারুণ্যকে সঠিক পথের সন্ধান দিতে পারলে এরা কখনো বিপদে যাবে না। বইপড়া উৎসব আমাকে এই বিশ্বাস দিয়েছে যে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানা, মুক্তিযুদ্ধের বইপড়ুয়ারা কখনো দেশ বিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত হবে না। এ-ই অর্জন আমাদের! আর তো কোনো চাওয়া নেই...এই নতুন প্রত্যয়দীপ্ত সূর্যোদয়ের অপেক্ষায়তেই আমরা, জ্ঞানের আলোয় যেদিন অবাক হবে সূর্যোদয়।'

ইনোভেটর বইপড়া উৎসব কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১৭ সালে জয়বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে।