১৪ এপ্রিল ২০২১ ১০:৩৮ পূর্বাহ্ন     |    ই-পেপার     |     English
১৪ এপ্রিল ২০২১   |  ই-পেপার   |   English
চামচামির রাজনীতি এবং ফেইসবুকে ভাড়া খাটা কর্মীরা
চামচামির রাজনীতি এবং ফেইসবুকে ভাড়া খাটা কর্মীরা

ছরওয়ার আহমদ

মার্চ ০২, ২০২১ ১২:৫৯ পিএম



বাঙালির যাপিত জীবনে ‘চামচা’ শব্দটি বহুল চর্চিত। বাংলা আভিধানিক মূল শব্দ হচ্ছে মোসাহেব। শব্দটি আর কয়েকটি অর্থবহন করে- তোষামুদে, পার্শ্বচর, হীন পার্শ্বচর, চাটুকার, খোশামুদে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ‘মোসাহেব’ শব্দের ব্যবহার ভিন্ন শব্দ দ্বারা চর্চিত ও ব্যবহৃত হলেও আমাদের সিলেট অঞ্চলে চামচা বা চাটুকার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এই ‘চামচা’ শব্দটি কাদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়? এরা সমাজের এক শ্রেণির মানুষ, যারা সামান্য স্বার্থে অন্যের কাছে গোপনে অথবা জনসম্মুখে দিবালোকে নিজের বিবেক বিসর্জন দিয়ে অন্যকে খুশী করতে যে কোনো কাজ করতে পারে। এই সমস্ত বিবেকহীন নিকৃষ্টদের ক্ষেত্রে সাধারণত এই শব্দ ব্যবহৃত হয়।
চাটুকারিতা এক পক্ষ লোকের কাছে জীবিকা উপার্জনের অবলম্বন। আদিকাল থেকে জীবিকা উপার্জনের জন্য চাটুকারিতাকে সমাজে থাকা কিছু মানুষ ‘পেশা’ হিসেবে বেছে নিয়েছে। খেয়াল করলে দেখা যায়- এটা তারা তাদের বংশ পরম্পরায় চালিয়ে যাচ্ছে।
সহজ কথায়, চাটুকারিতা হলো অন্যকে খুশী করতে নিজের বিবেক, লজ্জা- শরম বিসর্জন দিয়ে- বিনিময়ে নিজের জন্য কিছু সুবিধা ভোগ করা।
আমাদের সমাজে অনেক আছে, তাঁরা সাময়িক ফায়দা অথবা মনোরঞ্জনের জন্য চাটুকারের চাটুকারিতা ভালোবাসেন এবং চাটুকার লালন পালন করেন। আবার অনেকে না বুঝে চাটুকারের সেবা গ্রহণ করেন। এই চাটুকারী সেবা যারা ভালোবেসে গ্রহণ করেন অথবা ‘না বুঝে’ চাটুকারিতার শিকার হোন, তারা দিন শেষে কম- বেশি অপমান ও অপদস্তের শিকার হোন- তা ইতিহাস বলে দেয়।
ইতিহাসে জীবন্ত আছে এই বিবেকহীন চাটুকারদের কারণে অনেক রাজা- বাদশাকে তাদের সিংহাসন ছেড়ে দেশান্তরিত হতে হয়েছে। খুব সাধামাটাভাবে ইতিহাসের বড় বড় ঘটনাগুলোর দিকে না গিয়েও যদি আমাদের আশপাশে তাকাই এবং ভাবি, তাহলে দেখবো- চাটুকার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তিদের অসংখ্য সচিত্র।
পবিত্র ইসলাম ধর্মে মানুষকে সম্মানের সাথে বাঁচার জন্য আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী সৎ পথে থেকে কাজ করে জীবিকা নির্বাহের তাগিদ রয়েছে। আমার বিশ্বাস - অন্যান্য ধর্মেও অসৎ পথে উপার্জনে স্পষ্ট নিষেধ রয়েছে।
আমাদের সমাজের কিছু মানুষ তার জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে সামাজিক ও ধর্মীয় বিধান না মেনে অবৈধ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হয়। তার মধ্যে অনেকে পতিতাবৃত্তিকে জীবন যাপনের জন্য জীবিকা উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন হিসেবে বেছে নেয়। সমাজের সিংহভাগ মানুষের ধারণা জীবিকা নির্বাহে পতিতাবৃত্তি করা সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ। আমার দৃষ্টিতে তার সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ এই চামচাগিরি। চামচাগিরি আর পতিতাবৃত্তি এই দুটি কাজ নিজের বিবেক বিসর্জন দিয়ে করলেও এর মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। পতিতারা তাদের কর্মক্ষেত্রে আধাঁর- আলোর বিবেচনা করলেও চামচারা তা করে না। তারা দিবালোকে লক্ষ মানুষের সামনে নিজের বিবেক বিসর্জন দিয়ে অন্যের সন্তুষ্টির জন্য যেকোনো কাজ করতে পারে।
এই চামচাগিরী স্তরভেদে শিক্ষিত- অশিক্ষিত দু’ শ্রেণীর লোক করে থাকেন। শিক্ষিত বলতে- যাদের একাডেমিক শিক্ষা গ্রহণ করেও বিবেক জাগ্রত হয়নি তারা। আর অশিক্ষিত যারা, তারা বংশপরম্পরায় তাদের রক্তে প্রবাহিত আছে, সেই হিসেবে তারা করে থাকেন।
চামচামি বা চাটুকারিতা সকল যুগে, সকল দেশে, এক শ্রেণির লোক করে আসছে। আমাদের এই ভূখন্ডেও ছিল। তবে বর্তমানে এর মহামারী দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবটা সবচেয়ে বেশি পড়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর যারা বিভিন্ন সময় দেশ পরিচালনায় এসেছেন, তারা কেউ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। তারা ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে বিভিন্ন মতের চরিত্রহীনদের সমন্বয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করে। আর এই চরিত্রহীন নেতাদের আশ্রয়- প্রশ্রয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কর্মী গড়ে উঠার পরিবর্তে গড়ে উঠেছে চাটুকারের দল। সময়ের ব্যবধানে যার বিস্তার ঘটেছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
এই বিস্তার আজকের এই দিনে সামাজিক ব্যাধি হিসাবে মহামারী আকার ধারণ করেছে। যা আমাদের জন্য উদ্রেকের বিষয়। যারা বংশপরম্পরায় চাটুকার, যাদের রক্তে চাটুকারের রক্ত প্রবাহিত, তাদের নিয়ে আমার তেমন অনুশোচনা হয় না। অনুশোচনা হয় যারা অনেকটা না বুঝে অথবা পাবলিসিটির লোভে পড়ে বিভিন্ন কর্মের মাধ্যমে নিজেকে চাটুকারে রূপান্তরিত করতে যাচ্ছে- তাদের জন্য।
ইন্টারনেট এর এই দিনে, যে কেউ সামাজিক যোগাযোগ ফেইসবুক খুললে দেখতে পাবেন কেন্দ্রীয় অথবা জেলার নেতার পক্ষ থেকে শোক অথবা শুভেচ্ছা প্রকাশ করে যাচ্ছেন এক শ্রেণীর পাতিনেতা বা দলের সাধারণ কর্মী। আবার শোক প্রকাশে অত্যন্ত স্মার্টভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে টুপি মাথায় দুহাত তোলে প্রার্থনারত নেতার ছবি। নেতার দুহাত তোলে প্রার্থনারত ছবি ব্যবহার করে বুঝাতে চেষ্টা করা হয়- নেতার আবেগ প্রকাশ। প্রশ্ন জাগে, যারা এই দায়িত্ব পালন করেন- তারা কি নেতা কর্তৃক দায়িত্ব প্রাপ্ত? তাঁরা কি এইসব দায়িত্ব পালনের মতো যোগ্যতা রাখেন?
আমার প্রশ্ন, আপনারা যারা গায়ে পড়ে এই কাজগুলো করেন যে সকল নেতার পক্ষ থেকে, সেই সব নেতাদের নিজস্ব ফেসবুক একাউন্ট রয়েছে। যা তারা নিজেরা নিয়মিত ব্যবহার করেন। নেতার পক্ষ হয়ে আপনারা যে শোক আর শুভেচ্ছা বার্তা প্রকাশ করেন তা আজ পর্যন্ত নেতাদের পক্ষ থেকে তাদের নিজস্ব ফেসবুকে কি এই সমস্ত শোক অথবা শুভেচ্ছা বার্তা প্রকাশের কোনো নজির আছে বা কেউ দেখেছেন? যেহেতু নেতাদের ফেসবুকে এ ধরনের কোনো নজির নেই,সেহেতু প্রমাণিত হয় এই সমস্ত কাজ আপনারা গায়ে পড়ে নেতার সুদৃষ্টি আকর্ষণের একটা কৌশল অবলম্বন করছেন মাত্র।
এইসব কাজ যারা করে তাদেরকে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় ‘ভাড়োয়া’ বলে। যারা বংশপরম্পরায় নিজ স্বার্থে এমন নিম্নমানের কাজ করে আসছে তাদের জন্য আমার উদ্রেক হয় না,কারণ এই নিম্নমানের কাজ বাস্তবায়ন তার রক্তে প্রবাহিত। আমার উদ্রেক হয় তাদের নিয়ে, যারা না বুঝে তাদের কর্মের মধ্য দিয়ে ক্রমে ক্রমে চামচা বা ভাড়োয়াদের অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছেন। অনেক রাজনৈতিক কর্মী হয়তো মনে করছেন, এই কাজগুলো রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি অংশ। অথবা নেতার প্রতি আনুগত্যের বহি:প্রকাশ। রাজনীতিতে পরিপূর্ণতা পেতে অথবা নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে হয়তো এ কাজগুলো সম্পাদন করতে হয়।
অন্যদিকে এই সমস্ত সাধারণ কর্মীরা স্হানীয়ভাবে কিছু নেতার অধীনে থেকে নেতার কর্ম পন্হা অনুসরণ করেই এ কাজগুলো সম্পাদনে উৎসাহিত হোন। আমাদের দেখতে হবে এই নেতা কারা, তাদের রাজনীতিতে আগমন কেমন করে ঘটেছে, তাদের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং ব্যক্তিত্ব আছে কি না? স্বাভাবিকভাবে তাকালেই সহজে দেখা যায়- বিভিন্ন দলে অনেক নেতা ঝড়ে বক মরার মতো,কেউ আঞ্চলিকতা, তোষামোদি অথবা সাম্প্রদায়িকতার মধ্য দিয়ে সস্তা জনসমর্থন নিয়ে রাজনীতিতে এসেছে।
ব্যক্তিত্বহীন রাজনৈতিক নিয়ম নীতি বহির্ভূত পন্থায় যারা নেতা হয়েছে, তাদের অনুসরণ করে কোনো কর্মীর নেতা হওয়া সম্ভব নয়। রাজনীতিতে নেতার আসন অলংকিত করার প্রথম শর্ত হচ্ছে - প্রচুর রাজনৈতিক জ্ঞান আহরণ করা। এই জ্ঞান আহরণ করতে বিভিন্ন ধরনের বুদ্ধিভিত্তিক কাজের চর্চা এবং সমাজে এর স্ফোরণের চেষ্টা দৃশ্যমান করা।
দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে নিজেকে ব্যক্তিত্বশীল হিসেবে গড়ে তোলা। তৃতীয় শর্ত নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য থাকা। এই নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য বলতে নেতার একান্তজন হয়ে তার পক্ষে গায়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে শোক ও শুভেচ্ছা সহ বিভিন্ন ভঙ্গিমায় নেতার সাথে ছবি তুলে যত্রতত্র প্রকাশ নয়।
এই গায়ে পড়ে অনধিকার চর্চাবিদরা মানুষের কাছে ব্যক্তিত্বহীন হিসেবে বিবেচিত হয়। ব্যক্তিত্বহীন মানুষ নেতা হতে পারে না। আর যদি কখনো হয়েও যায় তাহলে এর স্থায়িত্ব বেশিদিন হয় না।
মানুষের জীবনে যেকোনো সফলতার ক্ষেত্রে আসল দিকটি হচ্ছে ব্যক্তিত্ব। এখানে ধনী- গরিব, দামী পোশাক বিবেচ্য নয়। ব্যক্তিত্ব মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সম্পদ। একজন ব্যক্তিত্বশীল মানুষের মর্যাদা রাজনৈতিক সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের কাছে অনেক বেশি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এর উজ্জ্বল উদাহরণ আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের আলোচিত সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজের কথা আমরা সকলে কমবেশি জানি। তাঁর নিজের দায়িত্ব পালনে অন্যের অন্যায় হস্তক্ষেপের কাছে তিনি মাথা নত না করে মন্ত্রীত্ব থেকে পদত্যাগ করেছিলেন- সেই ঘটনাটি বাংলাদেশের সচেতন মানুষ মাত্রই জানেন বলে বিশ্বাস করি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার এ পদত্যাগ আমলে না নিয়ে দীর্ঘ দিন তার বেতন ভাতা সহ সকল সুযোগ সুবিধা দিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও তাঁকে স্বীয় পদে ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হোন। সোহেল তাজ তাঁর আত্নমর্যাদা রক্ষায় সরকার থেকে দেয়া সকল সুযোগ- সুবিধা ফিরিয়ে দিয়ে প্রমাণ করেন- ক্ষমতা ও আর্থিক সুবিধার চেয়ে আত্মমর্যাদা অনেক বড়। তার এই ত্যাগ বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে আগামী প্রজন্মের জন্য উদাহরণ হিসেবে কাজ করবে।
সোহেল তাজের এই কঠিন সিদ্ধান্তে তিনি যেমন সর্বসাধারণের কাছে সম্মানীত হয়েছেন তেমনি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে হয়েছেন আরও কাছের ও বিশ্বস্থ। সোহেল তাজের পদত্যাগের দীর্ঘদিন পর প্রধানমন্ত্রী তাঁকে পেয়ে পুত্র স্নেহে বুকে জড়িয়ে ধরে তা প্রমাণ করেছে। আমার বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর সাথে সোলেহ তাজের স্নেহধন্য ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে পজিটিভভাবে ভাইরাল হওয়া দৃশ্যটি সকলের মনে ইতিবাচকভাবেই দাগ কেটেছে।
সোহেল তাজের এই উদাহরণকে সামনে রেখে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীরা চাটুকারিতা ও লোভ- লালসার এই রাজনীতি ছেড়ে মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও বুদ্ধিভিত্তিক সামাজিক কল্যাণমূলক কাজের মাধ্যমে নিজেকে একজন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ হিসাবে গড়ে তুলা সম্ভব। যার প্রভাব ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে ইতিবাচক প্রভাব রাখবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের আগামী নেতৃত্বে তারা অগ্রণী হবে।
একজন আশাবাদি মানুষ হিসাবে বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই আস্থা ও বিশ্বাসটুকু রাখতে চাই। রাত যত গভীর হয়, প্রভাত তত নিকটে আসে - আমাদের সামাজিক ইতিহাসে এটাই প্রমাণিত।
লেখক : সাবেক ভিপি ১৯৯৫- ৯৬ সাল, বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজ, সিলেট। হেড অব পাবলিক অ্যাফেয়ার্স; ৫২বাংলা, সংগঠক, স্যোসাল একটিভিস্ট।