০৮ মার্চ ২০২১ ০২:২২ পূর্বাহ্ন     |    ই-পেপার     |     English
০৮ মার্চ ২০২১   |  ই-পেপার   |   English
ইভ্যালি সিলেট টি২০ ব্ল্যাস্ট
শেহনাজ ও তুষারের দিনে, সেমিতে সিটি কর্পোরেশন
শেহনাজ ও তুষারের দিনে, সেমিতে সিটি কর্পোরেশন

মোহাম্মদ আফজল

ফেব্রুয়ারী ২২, ২০২১ ১২:৪৪ এএম



দিনের শুরুতেই সব আলো নিজের দিকে কেড়ে নেন তৌফিক খান তুষার, মারকুটে ব্যাটিং করে। ইচ্ছে মত চার ছয়ের ফুলঝুরি ছুটান। নানন্দিক এই ব্যাটিং শৈলিতে মন কেড়েছেন সবার। তুষার যখন ব্যাট করছিলেন তখন সব মনোযোগটা তার দিকেই ছিল, হবেই বা না কেন মাত্র ৩৯ বলে খেলছেন ৭৮ রানের দানবীয় ইনিংস যা টি২০ ক্রিকেটের জন্য মানানসই। যদিও ম্যাচ শেষে তার ইনিংস বিলীন হয়ে যায় শেহনাজ আহমেদের অপরাজিত ৮৭ রানের কাছে, ৬৩ বলে ৯ বাউন্ডারি আর ২ ছক্কায় এই রান করেন শেহনাজ।

১৫৭ রানের বড় লক্ষ্য তাড়া করতে উড়ন্ত সূচনা করে সিলেট ইউনাইটেড। দুই ওপেনার শেহনাজ এবং আরাফাত সানি জুনিয়র, দুজনে ৩ ওভারে যোগ করেন ৩৪ রান। দলীয় ৩৪ রানে আরাফাত জুনিয়র আউট হন ১১ বলে ৩ বাউন্ডারিতে ২৩ রান করে। কিন্তু শেহনাজ এক প্রান্ত আগলে রেখে মারমুখি ভঙ্গিতে খেলেন, তৃতীয় উইকেটে মেহেদীকে নিয়ে ৪৪ বলে ৭৯ যোগ করেন। মেহেদি ব্যাট থেকে আসে ২৫ বলে ৩৮ রান। দলীয় ১৩৪ রানে মেহেদি সাজ ঘরে ফিরে গেলেও, শেহনাজ তখন ক্রিজে একপ্রান্ত আগলে রাখছিলেন। কোনো রকম ঝুকি না নিয়ে শেহনাজ মাঠ ছাড়েন দলকে জিতিয়ে। তার অপরাজিত ৮৭ রানের উপর ভর করে সিলেট ইউনাইটেড ম্যাচ জিতে ছয় উইকেটে, ৫ বল হাতে রেখে। স্টার প্যাসিফিক ইউনাইটেডের হয়ে নাহিদুল, অলক কাপালি আর তাজিন নেন ১টি করে উইকেট।

শুরুতেই লিখেছি, তুষার মারমার কাট কাট ব্যাটিং করছিলেন। আগের ম্যাচে এক রানে জীবন পেয়ে ৪২ বলে ৬৮ রান করলেও আজ কোনো সুযোগ দেননি বোলারদের। স্ট্রাইকার্সের এই ব্যাটসম্যান ওয়ান ডাউনে খেলতে নেমে মাত্র ৩৯ বলে ৭৩ রানের দারুণ এক ইনিংস উপহার দেন দলকে। গত ম্যাচের তুলনায় আজ ছয় হাঁকিয়েছেন তিন টি বেশি, এই তার ছক্কা ছিল ৮টি। এই ইনিংসে ৮ ছক্কার বিপরীতে তিন চারের মার ছিল। ৭৩ রানের ইনিংসের পথে সিলেট উইনাইটেডের অধিনায়ক রাহাতুল ফেরদৌস জাভেদ এক ওভার থেকে তুষার তিন ছক্কা এবং এক চারে নেন ২২ রান।

টসে হেরে প্রথম ব্যাট করতে নেমে ইনিংসের তৃতীয় বলে ওপেনার তোফায়েলকে হারায় স্ট্রাইকার্স। আবু জায়েদ রাহির বলে শেহনাজের হাতে ক্যাচ দিয়ে সাজ ঘরে ফিরেন তোফায়েল। ওয়ান ডাউনে নেমে তুষার শুরু ধাক্কা কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করেন, আরেক ওপেনার নাহিয়ানকে নিয়ে দ্বিতীয় উইকেট যোগ করেন ৪৬ রান। দলীয় ৪৭ রানে ওপেনার নাহিয়ান ব্যক্তিগত ৩ রানে আউট হয়ে যান। তারপরেও মারকুটে ব্যাটিং করছিলেন তুষার। 

 দশ ওভার শেষে দলের রান যখন দুই উইকেটে ৭০, ক্রিজে তখন তুষার ব্যাট করছেন ৬১ রানে। তুষার ব্যক্তিগত ৭৮ রানে যখন শহিদুলের বলে সফর আলীর হাতে ক্যাচ দিয়ে সাজ ঘরে ফিরেন দলীয় রান তখন ৮৮। এতে সহজে বুঝা যাচ্ছে, এতো সময় নিজেই একাই দলকে টানছিলেন। 

তুষার আউট হওয়ার পর স্ট্রাইকার্সের রানের গতিটা ধীর হয়ে যায়, শেষ নয় ওভারে রান আসে মাত্র ৬৮ রান। তাও সম্ভব হয়েছে অলরাউন্ডার নাহিদুল ইসলামের ২০ বলে ৩৩ রানের ইনিংসের কল্যাণে। নাহিদ তিন ছক্কা আর এক বাউন্ডারিতে সাজান তার এই দৃষ্টিনন্দন ইনিংস। ব্যক্তিগত তৃতীয় সর্বোচ্চ ১১ রান আসে ফয়সালের ব্যাট থেকে। অতিরিক্ত খাত থেকে আসে ১৪ রান। নির্ধারিত ২০ ওভার শেষে স্ট্রাইকার্স সংগ্রহ করে ১৫৬ রান।

সিলেট ইউনাইটেডের হয়ে আবু জায়েদ রাহি ৪ ওভারে এক মেইডেনে ১৭ রানে নেন ৩ উইকেট। এছাড়া বঙ্গবন্ধু টি২০ কাপের ফাইনালের নায়ক শহিদুল ইসলাম নেন ২৯ রানে ২ উইকেট।

৬৩ বলে ৮৭ রান করে ম্যাচ সেরা নির্বাচিত হন সিলেট উইনাইটেডের শেহনাজ আহমেদ।

দিনের দ্বিতীয় ম্যাচে প্রথম ম্যাচের তেমন একটা আঁচ পাওয়া যায়নি। দুই দলের কোনো ব্যাটসম্যান ঝড় তুলতে পারেননি। বরং ডান হাতি অপস্পিনার আজাদ খান বল হাতে ভেলকি দেখিয়েছেন ঠিকি, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের এই স্পিনার চার ওভার বল করে ১৬ রানে নেন চার উইকেট। 

টসে জয়লাভ করে করে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন সিলেট রয়েলসে অধিনায়ক ইমতিয়াজ হোসাইন তান্না। শুরুতে ভাল কিছু করার ইঙ্গিত দেন তান্না, আজাদের করা প্রথম বলেই বাউন্ডারিতে রানের খাতা খুলেন তান্না। পরের বলে কাভারের উপর দিয়ে খেলতে গিয়ে সেখানে দাড়িয়ে থাকা ফিল্ডারের হাতে ধরা পড়েন তান্না। ইনিংসের তৃতীয় ওভারে আবারও আজাদের স্বীকার আরেক ওপেনার মিজানুর রাহমান সায়েম। 

তিনে নামা সিয়াম দলের শুরু বিপর্যয় কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করেন। আল আমীন জুনিয়রের সাথে গড়েন ৩১ রানে জুটি। দলীয় ৬১ রানে আউট হন সিয়াম, ব্যক্তিগত ২৩ রানে তিনি ফিরেন সাজঘরে। এরপর আল আমীন জুনিয়র ঠিকতে পারেননি বেশিক্ষন, ব্যক্তিগত ২২ রানে আল আমীনও যখন ফিরেন সাজ ঘরে দলের রান তখন ৬৪। এর আগে আজাদ ফিরান জাকের আলী অনিক এবং মুক্তার আলীকে।

৬৪ রানে চার উইকেট হারিয়ে ফেলা কুশিয়ারা ১০৯ রানের বেশি করতে পারেনি। নির্ধারিত ২০ ওভার শেষ হওয়ার এক বল আগেই রয়েলস অল আউট হয় ১০৯ রানে। রয়েলসকে এতো অল্প রানে বেধে ফেলার মূল কৃতিত্ব সিটির বোলার আজাদ খানের, চার ওভার বল করে ডান হাতই এই অপস্পিনার মাত্র ১৬ রানের বিনিময়ে নেন ৪ উইকেট।

ফলে ১১০ রানের সহজ লক্ষ্য দাঁড়ায় সিটির সামনে, এমন ছোট টার্গেট তারা করতে নেমে দুই ওপেনার সায়েম আলম রিজভী এবং এজাজ আহমেদ মিলে যোগ করেন ২৬ রান। ব্যক্তিগত ১৫ রানের আউট হন এজাজ আহমেদ। তিনে ব্যাট করতে নামা সিটির অধিনায়ক জাকির হাসান দ্বিতীয় উইকেটে রিজভীকে সাথে নিয়ে বড় একটা পার্টনারশিপ গড়ার চেষ্টা করেন, সেই জুটিতে ৩৪ রানের বেশি তুলতে পারেননি জাকির। ওপেনার রিজভীও ফিট হয়ে উইকেটে থিতু হতে পারেননি, তিনি সাজঘরে ফিরেন ব্যক্তিগত ২৫ রানে। এরপর দলীয় ৮৩ রানে আল আমীন জুনিয়রের বলে বোল্ড হয়ে সাজ ঘরে ফিরেন অধিনায়ক জাকির হাসান। 

ডান হাতি অপ স্পিন অলরাউন্ডার সাহানুর রাহমান বাকী কাজটা সাড়েন আরেক ব্যাটসম্যান জীবনকে নিয়ে। দুজনের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে সিটি কর্পোরেশন ওয়ারিয়র্স ম্যাচ জিতে ছয় উইকেট হাতে রেখে। ছয় উইকেটের এমন জয়ে সিলেট সিটি কর্পোরেশন চতুর্থ দল হিসেবে সেমি ফাইনাল খেলা নিশ্চিত করে। ইভ্যালি সিলেট টি২০ সেমিফাইনালে খেলতে হলে এই ম্যাচে সিটিকে অবশ্যই জয় পাওয়া লাগত। নতুবা পরের ম্যাচে এমকেবি প্লাটুন সিলেট উইনাইটেডকে হারাতে পারলেই হিসাবটা রান রেটের মারপ্যাঁচে পরে যেত। এই ম্যাচে জয়লাভের ফলে সেই সমীকরণে আর পড়তে হচ্ছে না তাদেরকে।

দিনের প্রথম ম্যাচে স্টার প্যাসিফিক স্ট্রাইকারস করা ১৫৬ রান তাড়া সিলেট উইনাইটেড মাত্র ছয় উইকেটে। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচে ব্যাটসম্যানদের নিদারুণ আত্মসমর্পণ প্রশ্ন জাগে এক পিচে এমন দুই রকম আচরণ কেন? উইকেট কি তার আগের রুপ পাল্টে নতুন কোনো রুপ নিয়েছিল। ম্যাচ শেষে এমন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ম্যাচ সেরা আজাদ খান, তার কাছে উইকেট প্রথম দুই তিন দিনের তুলনায় আজ বেশি ব্যাটিং বান্ধব ছিল মনে হয়েছে। কুশিয়ারা রয়েলস এমন পারফর্মেন্সকে ব্যাটিং কলাপস হিসেবে মনে করছেন আজাদ।  আজাদ বলেন, "পিচ আগের তুলনায় অনেক ভাল, প্রথম দুই তিন দিনের চেয়ে আজ বেশি ব্যাটিং বান্ধব ছিল। রয়েলস ব্যাটসম্যানরা সেই সুবিধা কাজে লাগাতে পারেনি। ব্যাটিং কলাপস করেছিল। তাই এমনটা হয়েছে।"

নিজের অসাধারণ বোলিং নৈপুন্যের রহস্য জানতে চাইলে আজাদ বলেন, "আসলে শুরু থেকেই পরিকল্পনা ছিল ভাল বল করার, যত বেশি ডট দেওয়া যায় সেটা চেষ্টা করেছি। আমি পরিকল্পনা মাফিক বল করে সফল হয়েছি। আর এই ম্যাচ না জিতলে সেমিফাইনালে খেলাটা কঠিন হয়ে যেত আমাদের জন্য। তাই জয় পাওয়াতে ভাল লাগছে।"

চার ম্যাচে দুই জয়ে সেমিফাইনালে আজাদের দল সিটি কর্পোরেশন। দলগত লক্ষ্য সম্পর্কে আজাদ বলেন, "আপাতত ফাইনালে আমাদের চোখ, আমরা ফাইনালে খেলতে চাই।" 

ম্যাচের ব্যবধানটা শুরুতেই গড়ে দিয়েছিলেন আজাদ খান। সিটির এই বোলারের স্পিন ঘূর্ণিতেই সিটির জয়টা সহজ হয়ে যায়। আজাদ চার ওভার বল করে ১৬ রানে নেন চার উইকেট। তার এই দারুন বোলিং নৈপুন্যে ম্যাচ সেরা নির্বাচিত হন। 

সোমবার দিনের একমাত্র ম্যাচে দুপুর সাড়ে ১২টায় এমকেবি প্লাটুন মোকাবেলা করবে সিলেট ইনাইটেডকে। 

ই/ডি