০৫ ডিসেম্বর ২০২০ ০৮:৩৬ অপরাহ্ন     |    ই-পেপার     |     English
০৫ ডিসেম্বর ২০২০   |  ই-পেপার   |   English
রশিদ হেলালীর মৃত্যু বার্ষিকীতে ফয়েজ আহমদ বাবর যা লিখেছিলেন
রশিদ হেলালীর মৃত্যু বার্ষিকীতে ফয়েজ আহমদ বাবর যা লিখেছিলেন

ফয়েজ আহমদ বাবর

অক্টোবর ৩১, ২০২০ ০২:১০ এএম
সাংবাদিক মোহাম্মদ রশিদ হেলালী। ফাইল ছবি

সদ্য প্রয়াত জৈন্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জৈন্তাপুর তৈয়ব আলী ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক ফয়েজ আহমদ বাবর দৈনিক জৈন্তা বার্তা পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবী মোহাম্মদ রশিদ হেলালীর ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে একটি লেখা গত ৩১-১০-২০১৮ ইং তারিখে দৈনিক সিলেটের ডাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। আজ সাংবাদিক মোহাম্মদ রশিদ হেলালীর ৭ম মৃত্যুবার্ষিকীতে লেখাটি হুবহু পুনঃ প্রকাশ করা হলো।

রশিদ হেলালী। সাংবাদিক হিসেবেই সর্বত্র পরিচিত। কিন্তু এর বাইরেও যে তিনি ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী, সমাজ হিতৈষী তা হয়তো অনেকেরই অজানা। কিন্তু বাস্তবেই রশিদ হেলালী জীবনের উল্লেখযোগ্য সময় পার করেছেন এলাকার সমাজসেবা ও শিক্ষার উন্নয়নে। শিক্ষা ও উন্নয়নে পিছিয়ে থাকা জৈন্তায় এখন অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যেগুলোর হাতেখড়ি সাংবাদিক রশিদ হেলালীর হাতে। বিশেষ করে বৃহত্তর জৈন্তার কর্মমুখি শিক্ষার জনক বলা চলে মোহাম্মদ রশিদ হেলালীকে।

আমি ১৯৯৮ সালে এমসি কলেজ থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন মাস্টার ফাইনাল প্রথম ব্যাচের পরীক্ষার্থী হিসেবে উত্তীর্ণ হয়ে কর্মজীবনে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছি। এর মধ্যেই সাংবাদিক শিক্ষানুরাগী রশিদ হেলালীর ডাক পেয়ে তাঁর সাথে দেখা করলাম। প্রথম দেখাতেই আমাকে আপনি বলে সম্বোধন করে তিনি বললেন- ‘বাবর সাহেব আপনি এমএ পাশ করেছেন শুনে আমি খুবই খুশি হয়েছি। আপনাকে আমার প্রতিষ্ঠিত কলেজে যোগদান করার জন্য এখানে ডেকেছি। আশা করি আপনি আমার কথা রাখবেন। আর আমি এলাকার ছেলে-মেয়েদের সুযোগ করে দিতে চাই। বিশেষ করে আপনাদের মতো শিক্ষিত মেধাবীরা হবেন জৈন্তাপুরের আগামী দিনের কান্ডারী।’

হেলালী ভাইয়ের কথা শুনে আমি খুবই মুগ্ধ হই। কিন্তু আমার সাথে আরও যাদের ডেকে ছিলেন তারা হেলালী ভাইয়ের কথায় আস্থা রাখতে পারেন নি। ওই সময় স্থানীয়দের মধ্যে কেবল আমি আস্থা রেখে জৈন্তাপুর তৈয়ব আলী টেকনিক্যাল এন্ড জেনারেল কলেজ এর জেনারেল শাখায় যুক্তিবিদ্যা বিষয়ে প্রতিষ্ঠাতাকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। পরবর্তীতে সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ সালে নিয়োগ বোর্ডের বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্ত নিয়োগ লাভ করি। নিয়োগ লাভের কয়েক মাস পরেই এমপিওভুক্ত হই। বর্তমানে আমি এ কলেজে সহকারী অধ্যপক হিসেবে কর্মরত আছি। সাধারণ শিক্ষায় রশিদ হেলালী প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক থেকে ডিগ্রি স্তর পর্যন্ত এবং কারিগরি শিক্ষায় এসএসসি ভোকেশনাল থেকে ডিপ্লোমা পর্যন্ত বিস্তৃত। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবছর শত শত শিক্ষার্থী তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যেমন এগিয়ে নিচ্ছে তেমনি ছড়িয়ে পড়ছে কর্মক্ষেত্রে। ইতোমধ্যে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারেও চাকুরী হয়েছে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের।

১৯৫৪ সালের ৫ ডিসেম্বর সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার দরবস্ত ইউনিয়নের ছাতারখাই গ্রামে সাংবাদিক মোহাম্মদ রশিদ হেলালীর জন্মগ্রহণ করলেও জীবনের মূল সময়টি কেটেছে জৈন্তাপুর উপজেলা সদরের বন্দরহাটি গ্রামে। এবং এ গ্রামেই তার পরিবারের বসবাস। গ্রামের পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি ভর্তি হন চাক্তা দারুল উলুম মাদ্রাসায়। সেখান থেকে ১৯৭৪ সালে দাখিল পাশ করে তার চিন্তা চলে যায় আধুনিক শিক্ষায়। তিনি আবার স্কুলে যান। কানাইঘাট উপজেলার দুর্গাপুর হাই স্কুলে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৭৬ সালে তিনি সেখান থেকেই এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বেও সাথে উত্তীর্ণ হন। পরে সিলেট মদন মোহন কলেজে ভর্তি হলেও পারিবারের হাল ধরতে শিক্ষা জীবনের ইতি টানতে হয়।

শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হলেও শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতা পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। প্রথমে তিনি ১৯৭৭ সালে তৎকালীন জাতীয় দৈনিক বাংলার বাণী ও দৈনিক বাংলা, দৈনিক আজাদ পত্রিকার উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করেন। এছাড়া স্থানীয় পত্রিকা সাপ্তাহিক যুগভেরী পত্রিকার সংবাদদাতা হিসেবেও কাজ করেন।

১৯৮৪ সালে তিনি বৃহত্তর জৈন্তার নেতৃস্থানীয়দের নিয়ে জৈন্তা অঞ্চলের নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা চালু করার উদ্যেগ নেন। ১৯৮৫ সালে অনুষ্ঠানিকভাবে ‘সাপ্তাহিক জৈন্তাবার্তা’ নামে পত্রিকা প্রকাশনা শুরু করেন। পাশাপাশি তিনি ঢাকা থেকে সাপ্তাহিক স্বাধীন বাংলা পত্রিকা প্রকাশ করতে থাকেন। পরবর্তীতে দুটি পত্রিকাই দৈনিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তিনি বিশ্বাস করতেন এবং বলতেন শিক্ষার মাধ্যমেই একটি এলাকার আর্থ সামাজিক উন্নতি ও দারিদ্র দূর করার সম্ভব। তাই তিনি ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ব্রিগেডিয়ার মুজমদার বিদ্যানিকেতন প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়।

১৯৯৫ সালে তার পৈত্রিক মালীকানাধীন জমিতে বাড়ীর পাশে পিতার নামে প্রতিষ্ঠা করেন জৈন্তাপুর তৈয়ব আলী কারিগরি ও জেনারেল কলেজ। পরবর্তীতে কারিগরি ও ডিগ্রী কলেজ আলাদাভাবে ২টি বৃহৎ কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। কারিগরি কলেজে চালু করেন ভোকেশনাল শাখা ও কৃষি ডিপ্লোমা শাখা। কৃষি ডিপ্লোমা শাখা বর্তমানে তৈয়ব আলী কৃষি প্রযুক্তি ইন্সটিটিউট হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে যা সিলেট বিভাগের একমাত্র বেসরকারি কৃষি ডিপ্লোমা ইন্সটিটিউট। মোহাম্মদ রশিদ হেলালী তার জন্ম স্থান ও বাল্য স্মৃতি বিজড়িত চতুল এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর ¯েœহের অকাল প্রয়াত কন্যা আমিনার নামে আমিনা হেলালী টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট এবং মায়ের নামে জহুরা উম্মে হেলালী কারিগরি কলেজ। ঐ অঞ্চলের কানাইঘাট উপজেলার সীমানায় প্রতিষ্ঠা করেন হারিছ চৌধুরী টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ। পিতার নামে মাতার নামে নিজ কন্যার নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা ছাড়াও বৃহত্তর জৈন্তা তথা সিলেট অঞ্চলে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা করতে তিনি অগ্রনী ভূমিকা রেখেছেন। গুণী এই মানুষটি ২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবর ইন্তেকাল করেন।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, জৈন্তাপুর তৈয়ব আলী ডিগ্রি কলেজ, জৈন্তাপুর, সিলেট।

ই/ডি