০২ ডিসেম্বর ২০২০ ০৯:১০ অপরাহ্ন     |    ই-পেপার     |     English
০২ ডিসেম্বর ২০২০   |  ই-পেপার   |   English
পংকজ গুপ্ত নয়, পরিচালনায় ১১ সদস্যের কমিটি
তারাপুর চাবাগান থেকে রাগীব রাবেয়া হাসপাতালসহ বাসাবাড়ি উচ্ছেদ করতেই হচ্ছে
তারাপুর চাবাগান থেকে রাগীব রাবেয়া হাসপাতালসহ বাসাবাড়ি উচ্ছেদ করতেই হচ্ছে

জৈন্তা বার্তা ডেস্ক

অক্টোবর ০৮, ২০২০ ০২:৩৯ এএম

দেবোত্তর সম্পত্তি দখল করে রাগিব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া আপিল বিভাগের রায় বহাল থাকছে। আপিল বিভাগ সর্বোচ্চ আদালতের রিভিউ এ আগের রায় বহাল রাখায় তারাপুর চাবাগান থেকে রাগীব আলী হাসপাতালসহ সকল বাসাবাড়ি উচ্ছেদ করে এসব স্থানে চা বাগান সৃজন করাসহ ১৭ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হবে। সর্বোচ্চ আদালতে ৩টি রিভিউ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় সম্পর্কে এমনটিই জানিয়েছেন সিলেট বারের আইনজীবী এডভোকেট বেদানন্দ ভট্টাচার্য্য।

তবে, রিভিউ রায়ে পাঁচ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে তিন কোটি টাকা প্রদানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে স্বাক্ষর জাল করে চা বাগানের ভ‚য়া সেবায়েত বনে যাওয়া রাগীব আলীকে। সেই সাথে সেবায়েত থেকে ‘মিস কন্ডাক্টের’ এর জন্য পংকজ গুপ্তকেও সরিয়ে দিয়েছেন আপীল বিভাগ। তারাপুর চা বাগান এখন ব্যক্তিগত দেবোত্তর সম্পত্তি নয়, এটি সরকারি দেবোত্তর সম্পত্তি এবং এই সম্পত্তি পরিচালনা করবেন নগরীর উচ্চ পর্যায়ের হিন্দু অধিবাসী ও বিভিন্ন অফিসের হিন্দু প্রতিনিধিবৃন্দ। এই কমিটিই বাগান এবং মন্দিরের পূজাসহ যাবতীয় ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

সর্বোচ্চ আদালত থেকে ২০১৬ সালের দেওয়ানী আপিলের রায়ে ছয় মাসের মধ্যে মেডিকেল কলেজটি অন্যত্র স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ। রায়ে মেডিকেল কলেজ স্থানান্তরের নির্দেশ বহাল রেখে বলা হয় মেডিকেল কলেজটি দেবোত্তর সম্পত্তির উপর নির্মিত হয়েছে। যে চুক্তির মাধ্যমে রাগীব আলীর পুত্র আব্দুল হাই তারাপুর চা বাগান ৯৯ বছরের লিজ অধিগ্রহণ করেছিলেন তা অবৈধ ঘোষণা করে লিজটি বাতিল করে তাদের বিরুদ্ধে ১৭ দফা নির্দেশনা দেন।

এদিকে আপিল বিভাগের রিভিউ রায় প্রকাশ হয় গত ২৭ সেপ্টেম্বর। জালিয়াতি ও প্রতারণা করে নগরীর তারাপুর চা বাগান আত্মসাৎকারী রাগীব আলীকে মেডিকেল কলেজ স্থানান্তর করতেই হচ্ছে। তারাপুর চা বাগানের স্বত্ব নিয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা প্রদত্ত রায়ের বিরুদ্ধে দাখিল করা ৩টি রিভিউ পিটিশনের শুনানী শেষে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ  হয়। 

তারাপুর চা বাগানের মালিকানা সংক্রান্তে রাষ্ট্রপক্ষের দায়ের করা সিভিল আপীল মোকদ্দমা নং- ১৬৩/২০০৯ এর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয় বিগত ১৯ জানুয়ারী ২০১৬ ইং তারিখে। সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বে গঠিত ৪ সদস্যের বেঞ্চ এ আপীলের রায় প্রদান করেন। ঐ রায়ের বিরুদ্ধে ৩টি রিভিউ আবেদন দাখিল করা হয়। এর একটি আবেদন দাখিল করেন স্বাক্ষর জালিয়াতি ও প্রতারণা মামলার সাজাপ্রাপ্ত  বাগানের কথিত লেসি আব্দুল হাই। অপর দুটি আবেদন দাখিল করা হয় জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র ও তারাপুর এলাকার ভূমি গ্রহীতাদের পক্ষে। ৩টি রিভিউ আবেদন এক সাথে শুনানী হয়। ৫ দফা শুনানী শেষে মাননীয় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসাইনের নেতৃত্বে ৭ সদস্যের আপীল বেঞ্চ আবেদন পর্যালোচনা শেষে পর্যবেক্ষণসহ বিষদ রায় প্রদান করেন। ৭ সদস্যের আপীল বেঞ্চের অন্যান্য সদস্যরা ছিলেন- মাননীয় বিচারপতি মোহাম্মদ ঈমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি র্মিজা হোসাইন হায়দার, বিচারপতি জিনাত আরা, বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মোঃ নুরুজ্জামান। 

২০১৬ সালে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পঙ্কজ গুপ্তকে তারাপুর হস্তান্তর করার দিন (ফাইল ছবি)

 

রায়ে আদালত উল্লেখ করেছেন, তারাপুর চা বাগানকে পাবলিক দেবোত্তর সম্পত্তি ঘোষণা করে এর সংরক্ষণ ও তত্বাবধানের জন্য একটি ব্যাবস্থাপনা কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। ১১ সদস্যের এই ব্যাবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা হবেন- জেলা প্রশাসক মনোনীত সিলেট নগরীর সম্ভ্রান্ত হিন্দু অধিবাসী, মেয়র মনোনীত সিলেট সিটি কর্পোরেশনের একজন হিন্দু কাউন্সিলর, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মনোনীত সিলেট জেলা পরিষদের একজন হিন্দু সদস্য না থাকলে মনোনীত একজন সম্ভ্রান্ত হিন্দু অধিবাসী, শ্রী চৈতন্য কালচারাল সোসাইটির অধ্যক্ষ, সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটি মনোনীত একজন হিন্দু প্রতিনিধি, সিলেটের জেলা জজ মনোনীত একজন হিন্দু বিচারক, জেলা প্রশাসন নগরীর ১০টি শীর্ষস্থানীয় মন্দিদের সেবায়েত বা পুরহিতদেও সাথে পরামর্শ করে শ্রী শ্রী রাধা কৃষ্ণ জিউ মন্দিরের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সদস্য থেকে ১ জন সেবায়েত, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মনোনীত বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন হিন্দু শিক্ষক, প্রয়াত বৈকুন্ঠ চন্দ্র গুপ্তের পরিবারের প্রতিনিধি, সিলেট জেলার পুলিশ সুপার মনোনীত একজন হিন্দু পুলিশ কর্মকর্তা ও কাজলশাহস্থ যুগলটিলা আখড়া কমিটির একজন প্রতিনিধি। 

৫ বছরের জন্য এই ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হবে। এই ১১ জন মনোনীত ব্যক্তির মধ্য থেকে কমিটির সভাপতি, সহ সভাপতি, সচিব/সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ ও সহ সম্পাদক নির্বাচিত হবেন। সভাপতি এই কমিটির নির্বাহী প্রধান হিসেবে থাকবেন। সভাপতির নির্দেশে সচিব/সেক্রেটারি সার্বিক দায়িত্ব পালন করবেন। এই ব্যবস্থাপনা কমিটিই শ্রী শ্রী রাধা কৃষ্ণ জিউ দেবতার পূজারীসহ প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ করবেন। ব্যবস্থাপনা কমিটির সচিব/সম্পাদক তারাপুরের দেবোত্তর সকল স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব ও দলিলাদি সংরক্ষণ করবেন এবং বেদখল এবং অপদখলীয় সম্পত্তির তালিকা প্রস্তুত করবেন এবং দেবোত্তর সম্পত্তির একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা সিলেটের জেলা জজ এর কাছে জমা দেবেন। 

আদালত বলেন, পংকজ কুমার গুপ্ত বিগ্রহের সংরক্ষণ বা ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ হয়েছেন। দেবোত্তর সম্পত্তি তিনি বেআইনীভাবে হস্তান্তর করেছেন। তার দায়িত্বহীন আচরণের কারণে ডা. পংকজ কুমার গুপ্ত এই পদে থাকার অধিকার হারিয়েছেন। 

বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা প্রদত্ত মূল আপীল মামলার রায়ের রিভিউ আবেদনকারী, তারাপুর চা বাগানের কথিত লিজ গ্রহীতা আব্দুল হাইকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ৫ কোটি টাকা সেবায়েতকে ফেরত দেয়ার জন্য। রিভিউ আবেদনে মাননীয় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসাইন এই টাকার অংক কমিয়ে ৩ কোটি টাকা আগামী ৬ মাসের মধ্যে ব্যবস্থাপনা কমিটির নিকট হস্তান্তরের জন্য কথিত লেসি দন্ডপ্রাপ্ত আব্দুল হাইকে নির্দেশ প্রদান করেছেন। তবে, অপর দুই রীটকারী জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজ ও ভূমি গ্রহীতাদের এই আপীলে কোন আইনগত অবস্থান না থাকায় তাদের আবেদনের ব্যাপারে কোন নির্দেশনা দেননি আদালত। 

 

রিভিউ আবেদনকারী আব্দুল হাই ও জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজের পক্ষে রিভিউ আবেদন শুনানী করেন ব্যরিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ ও ভূমি গ্রহীতাদের পক্ষে শুনানীতে অংশ নেন ব্যরিস্টার ফিদা এম. কামাল।     

 

রিভিউ রায়ের ব্যাপারে মন্তব্য জানতে চাইলে এডভোকেট বেদানন্দ ভট্টাচার্য্য বলেন, ‘জরিমাণার পরিমাণ পাঁচ কোটি টাকা থেকে তিন কোটি কমানোর বিষয়টি ছাড়া এই রায়ে রাগীব আলী পক্ষ সব হারিয়েছেন। পূর্বের রায় বহাল থাকায় তাকে সবকিছু নিয়ে তারাপুর চা বাগান থেকে চলে যেতে হবে। আর সেবায়েত থেকে পঙ্কজ গুপ্তকে সরিয়ে দেওয়া হলেও বৈকুন্ঠ গুপ্তের বংশের একজন প্রতিনিধি ১১ সদস্যের কমিটিতে থাকছেন। সেই ক্ষেত্রে তাদের অংশ গ্রহণ থাকছেই’।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ১৯১৫ সালের ২ জুলাই তারাপুর চা-বাগানের তৎকালীন মালিক বৈকুণ্ঠচন্দ্র গুপ্ত রাধাকৃষ্ণ জিউ দেবতার নামে বাগানটি উৎসর্গ করেন। তখন থেকেই ৪২২ দশমিক ৯৬ একর জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠা তারাপুর বাগান পুরোটাই দেবোত্তর সম্পত্তি। বৈকুণ্ঠচন্দ্র গুপ্তের পর তাঁর ছেলে রাজেন্দ্র গুপ্ত এ দেবোত্তর সম্পত্তির সেবায়েত হন। ১৯৬৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বাগানটি ‘শত্রæ সম্পত্তি’ হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে রাজেন্দ্র গুপ্ত ও তাঁর তিন ছেলে শহীদ হন। পরবর্তীকালে পঙ্কজ কুমার গুপ্ত মেডিকেল শিক্ষা গ্রহণে যুক্তরাজ্য চলে গেলে ১৯৯০ সালে ভুয়া সেবায়েত সাজিয়ে বাগানটির দখল নেন রাগীব আলী।

গত ১৯ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের আপিল বিভাগ এক রায়ে তারাপুর চা-বাগান দখল করে গড়ে ওঠা সব স্থাপনা ছয় মাসের মধ্যে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি বাগানটি প্রকৃত সেবায়েতকে বুঝিয়ে দেওয়া, বাগান দখল নিয়ে জালিয়াতি ও প্রতারণার মামলা সক্রিয় করাসহ ১৭টি নির্দেশনা দেওয়া হয়। রায়ের ১৭টি নির্দেশনার একটি ছিল ২০০৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর করা মামলা দুটির পুনঃ তদন্ত করা। এরপর মামলা দুটি তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ২০১৬ সালের ১০ জুলাই আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। ১০ আগস্ট গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে রাগীব আলী ও তাঁর ছেলে ভারতে পালিয়ে যান। তিন মাসের মাথায় প্রথমে ছেলে, পরে রাগীব আলী দেশে ফিরে গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীতে চা বাগানের বন্দোবস্ত নিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের স্মারক জালিয়াতির মামলায় রাগীব আলী ও তার ছেলের চারটি ধারায় মোট ১৪ বছর কারাদÐ হয়।  

এদিকে উচ্চ আদালতের রায়ের পর ২০১৬ সালের ১৫ মে তারাপুর চা-বাগানের বিভিন্ন স্থাপনা ছাড়া ৩২৩ একর ভূমি সেবায়েত পঙ্কজ কুমার গুপ্তকে বুঝিয়ে দেয় জেলা প্রশাসন। 

সিলেট নগরের পাঠানটুলা এলাকার উপকণ্ঠে তারাপুর চা-বাগান। প্রবেশমুখে রাগীব আলী ও তাঁর স্ত্রীর নামে জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন করা হয় ১৯৯৯ সালে। পরে নার্সিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়। মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল, নার্সিং ইনস্টিটিউট ভবন রয়েছে প্রায় সাত লাখ বর্গফুট জায়গায়। এর মধ্যে ১০ তলাবিশিষ্ট ভবন ২টি, ৫ তলাবিশিষ্ট ছাত্রাবাস ভবন ৪টি, ৬ তলাবিশিষ্ট হাসপাতাল ভবন ১টি। মেডিকেল শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ১০০ ও নার্সিং শিক্ষার্থী ৫৫০। চা-বাগানের জমিতে কয়েকশ পরিবার অবৈধভাবে বসবাস করছে। তারা এসব জমিতে অট্টালিকাও গড়ে তুলেছে। এই রায়ের ফলে এসব দখলদারদেরকেও বাগানের জমি ছাড়তে হবে।

 

ই/ডি